শিশুর মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশ, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ অনেকটাই নির্ভর করে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পর প্রথম পাঁচ বছর মস্তিষ্কের দ্রুততম বিকাশ ঘটে। এ সময়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হলে শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও আচরণগত বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শিশুর খাদ্যতালিকায় সুষম ও পুষ্টিকর খাবার রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশি মিষ্টি খেলে শিশুর বুদ্ধি বাড়ে—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার রক্তে শর্করার মাত্রার ওঠানামা ঘটিয়ে শিশুকে অস্থির ও খিটখিটে করে তুলতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের খাবার খেলে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, দাঁতের ক্ষয় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। কিছু গবেষণায় অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবারের সঙ্গে শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাবের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডিম, মাছ, চর্বিহীন মুরগির মাংস, দুধ, ডাল, ছোলা ও বাদাম নিয়মিত খাওয়ালে মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সহজ হয়।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। সামুদ্রিক তৈলাক্ত মাছ, তিসির বীজ, চিয়া বীজ, আখরোট ও কুমড়ার বীজ এ পুষ্টির ভালো উৎস।
ফোলেট ও ভিটামিন কে নতুন কোষ গঠন এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। এসব পুষ্টি পাওয়া যায় পালং শাক, লাল শাক, ব্রকলি, মসুর ও মুগ ডালে।
ভিটামিন বি মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে এবং খাবারকে শক্তিতে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। কলা, ওটস, লাল চাল, ডিম, ডাল ও দুধে এ ভিটামিন রয়েছে।
কোলিন স্মৃতিশক্তি ও শেখার দক্ষতা বাড়াতে কার্যকর। ডিমের কুসুম, সয়াবিন, চিনাবাদাম, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও ব্রকলি কোলিনের ভালো উৎস।
এ ছাড়া আয়োডিন মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, দুধ, দই ও ডিম থেকে এ পুষ্টি পাওয়া যায়। জিঙ্ক স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ছোলা, কুমড়ার বীজ, লাল মাংস, ডাল ও দুগ্ধজাত খাবারে জিঙ্ক রয়েছে।
আয়রনের অভাবে শিশুর শেখার ক্ষমতা ও মনোযোগ কমে যেতে পারে। তাই খাদ্যতালিকায় কলিজা, লাল মাংস, পালং শাক, ডাল, কিশমিশসহ আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি কমলা, পেয়ারা, আম, গাজর, টমেটো, বিট ও ক্যাপসিকামের মতো বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি মস্তিষ্কের কোষকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিন, শাকসবজি, ফল ও স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখার পাশাপাশি কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি, চিপস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত খেলাধুলা এবং পর্যাপ্ত ঘুমও শিশুর মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর মেধা বাড়ানোর কোনো জাদুকরি খাবার নেই। বরং সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ—এই চারটি বিষয়ই শিশুর মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশ ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি।
এসি/আপ্র/২৯/০৭/২০২৬