রাজধানীর গেণ্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে পিস্তল হাতে লোকজনকে ধাওয়া করার ঘটনায় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তাঁর দাবি, মাদকের বিস্তার রোধে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মাঠে নেমেছেন। অতীতে ওই এলাকায় অভিযানে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত ছয় সদস্য গুলিবিদ্ধ হওয়ায় সতর্কতার অংশ হিসেবে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করেছেন বলেও জানান তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে ইশরাক হোসেনের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, এক হাতে হ্যান্ডমাইকের মাউথপিস এবং অন্য হাতে পিস্তল নিয়ে গাড়ি থেকে নেমেই একদল লোককে ধাওয়া করছেন তিনি। পিস্তলের স্লাইড টেনে গুলি করার জন্য প্রস্তুত করে লোকগুলোর দিকে তাক করে ‘অ্যাই দাঁড়া, দাঁড়া’ বলে চিৎকার করতেও দেখা যায় তাঁকে। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’।
ভিডিওতে ইশরাক ছাড়াও আরেকজনকে অস্ত্র হাতে কয়েকজনকে ধাওয়া করতে দেখা যায়। ঘটনাস্থল হিসেবে গেণ্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পিস্তল হাতে অভিযানে নামার কারণ জানতে চাইলে শনিবার রাত ৮টার দিকে ইশরাক হোসেন বলেন, এ ঘটনা বুঝতে হলে এলাকার মাদক পরিস্থিতির দীর্ঘ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁর ভাষ্য, ঢাকা-৬ আসনের গেণ্ডারিয়া এলাকার ঘুণ্টিঘর ও মুন্সিরটেক এলাকায় গত ছয় মাসে মাদকের বিস্তার বেড়েছে। সেখানে দিনের বেলায় মাদক কেনাবেচা ও সেবন চলছে এবং বাসাবাড়ি থেকে রশিতে করে মাদক বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। বাড়ির ভেতরে অবৈধ মদ, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক পাওয়ার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।
ইশরাক বলেন, এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি গেণ্ডারিয়া থানা ও ওয়ারী অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁর দাবি, বিভিন্ন বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ওই এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতায় তা হয়নি।
মাদক ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলেজ ও স্কুলও প্রভাবিত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে এলাকার মানুষ তাঁর কাছে অভিযোগ নিয়ে আসছেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমাদের সরকার জনগণের নির্বাচিত সরকার, আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। যে কারণে আমরা শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করেই চলছি না। আমি নির্বাচিত হওয়ার আগে বারবার জনগণের সামনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, ওয়াদা করেছি মাদক বন্ধ করবো, মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবো।”
অস্ত্র প্রদর্শনের ব্যাখ্যায় ইশরাক বলেন, “এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমি আজকে গিয়েছিলাম। যে আগ্নেয়াস্ত্রটি আমার হাতে দেখা গেছে, সেটি বৈধ অস্ত্র, আমার কোমরেই থাকে। বিগত সময়ে সেখানে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অন্তত ছয়জন সদস্য সেখানে অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। যে কারণে আজকে আমি সতর্কতা অবলম্বন করে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করেছি।”
তিনি আরো বলেন, “এলাকার জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমি এটা করেছি সামাজিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে। স্থানীয় পুলিশও নানা সীমাবদ্ধতার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আমি নিজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অবহিত করেছি এলাকার বিষয়ে, উনিও কী করবেন, সারাদেশে মাদকের বিস্তার। তাই আমরা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে তুলবো।”
ইশরাকের দাবি, ঘটনাস্থলে যাওয়ার ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে সেখানে যাওয়ার জন্য জানান। এরপর পুলিশ গিয়ে ব্যবস্থা নেয়।
গেণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান মনির বলেন, “উনারা ছয়জনকে ধরে মাদকসেবী বলে জানালে আমরা গিয়ে নিয়ে আসি। তাদের কাছে কিছু পাউডার পাওয়া গেছে, সেগুলো কী, তা পরীক্ষায় জানা যাবে।”
অভিযান চালানোর আগে পুলিশকে জানানো হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেননি তিনি।
পুলিশের ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা বলেন, “আমরা যতটুকু জেনেছি, ছয়-সাতজনকে ধরে তিনি থানায় দিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী মহোদয় (অভিযানের বিষয়ে) পুলিশকে আগে থেকে জানাননি, আমরা পরে বিষয়টি জেনেছি।”
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইশরাকের ভিডিওর নিচে সাখাওয়াত হোসেন খান নামের একটি আইডি থেকে প্রশ্ন করা হয়, “এভাবে ওপেন কেউ পিস্তল ব্যবহার করতে পারে!” ওই মন্তব্যের জবাবে অনেকে লাইসেন্স করা পিস্তল ব্যবহারের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। মো. হোসেইন আক্তার তানজিন তাঁকে ‘গরীবের ফাটাকেষ্ট’ বলে মন্তব্য করেন। মো. মাসুম লেখেন, “প্রথমে ভাবছিলাম কোনো ছবির শ্যুটিংয়ের দৃশ্য,পরে দেখি বাস্তব ঘটনা।” মোহাম্মদ হোসেইন প্রশ্ন তোলেন, “দেশে পুলিশের অভাব পড়ছে?” সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ভিডিওটিতে পাঁচ হাজার মন্তব্য পড়েছিল।
এর আগে সন্ধ্যা ৭টা ২২ মিনিটে ইশরাক হোসেনের ফেসবুক পেজে দেওয়া আরেকটি পোস্টে ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। পোস্টে বলা হয়, মাদক কারবারিরা যে দলেরই হোক, তাঁদের ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি নিজের দলের কেউ মাদক কারবারে জড়িত থাকলে তাঁর শাস্তি আরো বড় হবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। ঢাকা-৬ আসনের বিভিন্ন এলাকায় এর আগেও মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর কথা উল্লেখ করে এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে এলাকাবাসীর সহযোগিতা চাওয়া হয়।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, “এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় নেই। তবে এটা না করলেই পারতেন। একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন।”
তিনি আরো বলেন, “ওনার প্রটেকশনের জন্য তো ঢাকা মেট্রোপলিটনের অফিসাররা আছেন। তাদের নিয়ে সেটা করলেই ভালো হতো।”
সানা/আপ্র/১৮/১০/২০২৬