নজরুল ইসলাম
একটি শিশুর মৃত্যু একটি পরিবারের পৃথিবীকে অন্ধকার করে দেয়; আর একের পর এক শিশুহত্যা পুরো সমাজের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই জান্নাতুল তাজমিনের হত্যাকাণ্ড দেশবাসীকে আবারও স্তম্ভিত করেছে। অপ্রতিমের নিথর দেহ উদ্ধার হয়েছিল লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে, আর তাজমিনের মরদেহ পাওয়া গেল ধানখেতে। স্থান আলাদা, ঘটনার বিবরণ আলাদা; কিন্তু দুটি মৃত্যুর পর একই প্রশ্ন সামনে এসেছে- আমাদের শিশু-কিশোরেরা কতটা নিরাপদ?
অপ্রতিম ছিল ১৩ বছরের স্কুলছাত্র। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী তার ব্যবহৃত আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। অন্যদিকে, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি ধানখেত থেকে। মৃত্যুর আগে বাবাকে নিজের অবস্থানের তথ্য পাঠিয়েও শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারেনি সে। এই দুটি ঘটনা কেবল অপরাধের নির্মমতা প্রকাশ করে না; এগুলো আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও শিশু সুরক্ষার বাস্তব চিত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
একটি মুঠোফোনের জন্য প্রাণ কেড়ে নেওয়া কিংবা একজন কিশোরীর নিরাপদে বাড়ি ফেরার অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক বিচ্যুতি নয়। এর পেছনে রয়েছে অপরাধপ্রবণতা, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি, অন্যের জীবন ও অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা এবং অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে দায়িত্বহীন মনোভাব। তবে কোনো ঘটনার পূর্ণ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অপরাধের কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে বিচারের মুখোমুখি করতেই হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের আলোচনা প্রায়ই কোনো মর্মান্তিক ঘটনার পর শুরু হয়, আবার কিছুদিন পর স্তিমিত হয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিটি ঘটনার পর প্রতিরোধব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী হয়? নিখোঁজ শিশুকে দ্রুত খুঁজে বের করার ব্যবস্থা, বিপদে পড়া শিশুর সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত পুলিশি সহায়তা- এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটুকু?
তাজমিনের মৃত্যুর আগে বাবাকে অবস্থানের তথ্য পাঠানোর বিষয়টি বিশেষভাবে ভাবিয়ে তোলে। প্রযুক্তি তখনই জীবনরক্ষাকারী হতে পারে, যখন সেই তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়। পরিবারের সদস্যদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া, নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ামাত্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপদ যাতায়াত, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে চলাফেরার ঝুঁকি এবং বিপদের সময় কোথায় সাহায্য চাইতে হবে- এসব বিষয়ে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সচেতনতা গড়ে প্রয়োজন। তবে, সব দায় পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না।
নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। পুলিশের তদন্তে গতি, অপরাধস্থলের আলামত সংরক্ষণ, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, ডিজিটাল তথ্যের যথাযথ ব্যবহার ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি কিশোর অপরাধের পেছনে থাকা সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক কারণগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শাস্তির নিশ্চয়তার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে শিক্ষা, মূল্যবোধ, সামাজিক নজরদারি ও পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগ জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অপরাধের সংবাদ পরিবেশনে দায়িত্বশীলতা। নিহত শিশুদের ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করতে হবে; যাচাই না করা তথ্য, গুজব কিংবা অনুমানকে সত্য হিসেবে প্রচার না করা । তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে জনসাধারণকে সঠিক তথ্য জানাতে হবে। জনরোষ যেন নিরপরাধ কাউকে হয়রানির কারণ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
অপ্রতিম ও তাজমিন আর ফিরে আসবে না। তাদের পরিবারের শূন্যতা কোনো রায় কিংবা ক্ষতিপূরণ পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তাদের মৃত্যু যদি আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সংশোধনে বাধ্য না করে। তবে সেই ব্যর্থতার দায় শুধু অপরাধীর নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও। আজ প্রয়োজন শোকের আনুষ্ঠানিকতা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ; আশ্বাস নয়, জবাবদিহি; প্রতিশোধের আবেগ নয়, আইনের শাসন।
আর কত অপ্রতিম, আর কত তাজমিনের প্রাণ গেলে আমাদের বিবেক জাগবে? এই প্রশ্নের উত্তর বক্তৃতায় নয়, কাজে দিতে হবে। প্রতিটি শিশুর নিরাপদে বেঁচে থাকা, চলাফেরা করা ও ঘরে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করাই হোক অঙ্গীকার। শিশুদের কান্না থামাতে হলে অপরাধের বিরুদ্ধে আপসহীন হতে হবে- আজই, এখনই।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজচিন্তক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬