গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি===

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতাবলয় ভেঙে যাবে বলতে নারাজ ছিলেন ফুকো

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:০৫ পিএম, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২২:০৯ এএম ২০২৬
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতাবলয় ভেঙে যাবে বলতে নারাজ ছিলেন ফুকো
ছবি

ছবি সংগৃহীত

মিশেল ফুকো একটা জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে থেকে একই বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু বলার মতো বুদ্ধিজীবী ছিলেন না; এমনকি জ্ঞানকে ‘নিরীহ ও অরাজনৈতিক’ মনে করতেন না। ক্ষমতাকেও ‘নির্দিষ্ট’ করেননি। মার্কসীয় তত্ত্ব যেমন বলে রাষ্ট্রক্ষমতা বলয়ের সবচেয়ে বড় নিপীড়ক শক্তি- এমনটিও ভাবতেন না। ক্ষমতার চর্চা যে কোনো জায়গায় থাকতে পারে। তার মতে, সবকিছু থেকে ক্ষমতা আসে এবং সবকিছুর ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়। তিনি ক্ষমতা ও জ্ঞানকে বিপজ্জনক বলেছেন। তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পেলে ক্ষমতাবলয় ভেঙে যাবে- এমন বলতে নারাজ। তিনি দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ব্যাপারটা জালের মতো বিস্তৃত। এই জালের ফাঁদে আটকা রয়েছে জ্ঞানও। তাই জ্ঞানও ক্ষমতা চর্চার বাইরে নয়। এ বিষয় নিয়েই এবারের সাহিত্য পাতার প্রধান রচনা

ফুকোর জৈব-ক্ষমতা’ বা ‘বায়োপাওয়ার’ তত্ত্বটি হলো আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে মানুষের শরীর, জীবন এবং জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে, তার একটি বিশ্লেষণ। বায়ো-পাওয়ার বা জৈব-ক্ষমতা হলো এমন এক অদৃশ্য ও সূক্ষ্ম ক্ষমতা যা বলপ্রয়োগ বা হিংস্রতার মাধ্যমে নয়; বরং জীবনকে টিকিয়ে রাখা, নিয়মতান্ত্রিক করা এবং নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে কাজ করে।

ফরাসি দার্শনিক ফুকো ‘মানবতাবাদী’ ছিলেন না। ‘মানবতাবাদী’দের তুমুল সমালোচনাও করেছেন। কিন্তু তিনি বরাবরই ‘মানবাধিকারের’ পক্ষে ছিলেন। এটুকুতেই খটকা লাগতে পারে তার ব্যাপারে অনেকের। বিশেষত ‘মানবতাবাদী’ ও ‘মানবাধিকার’ বিষয়ের ফারাক নিয়ে। তিনি ‘মানবতাবাদী’ নন, কারণ মানবতাবাদের তথাকথিত ‘নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের’ কাছে নতি স্বীকার করতে তিনি রাজি ছিলেন না। মানবতাবাদকে ‘আলোকপ্রাপ্তি’র সমার্থক হিসেবে দেখা হতো সে সময়ে ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশে। ‘পবিত্র সত্তা’ হিসেবেও দেখা হতো। ১৯৬৬ সালে ফুকো বলেন, ‘আমি মানবতাবাদী নই; বরং এর সমালোচক।’ কিন্তু পরে তিনিই আবার বলেছেন, ‘আমি এখন আলোকপ্রাপ্তি যুগের ঐতিহ্যের অনুসারী।’ তার মানে ফুকো এনলাইটমেন্ট বা আলোকপ্রাপ্তির বিষয়ে নিজের অবস্থান পাল্টেছিলেন। এই যে আগের অবস্থান পাল্টানো সে বিষয়েও তার মত, যেটি যেমন ছিল সেটি তেমনই থাকবে কেন? কেন ধারাবাহিক সুশৃঙ্খলভাবে সব ঘটবে?

ফুকো তার বই দ্য অর্ডার অব থিংস বইতে তাই খুব পরিস্কারভাবে বলেছেন, মানুষের সমাপ্তি খুবই কাছে। খুব প্রথাগত সেকেলে সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গির ‘মানবতাবাদ’ যেভাবে মনে করে ‘মানুষ’ হলো সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু, যার একটি অপরিবর্তনীয় ও শাশ্বত ‘স্বভাব’ বা ‘সত্তা’ রয়েছে সেটা আসলে ঠিক নয়। ফুকো মনে করেন, আমরা আজকে ‘মানুষ’ বলতে যা বুঝি, তা আসলে অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ভাষা, অর্থনীতি ও জীববিজ্ঞানের মতো আধুনিক জ্ঞানকাণ্ডের মাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি বিমূর্ত ধারণা মাত্র। জ্ঞান কাঠামোর পরিবর্তন হলে এই ধারণাও বিলুপ্ত হতে বাধ্য। ফুকো মনে করেন, হাসপাতাল, কারাগার, রাষ্ট্রের মতাদর্শিক হাতিয়ারগুলো ‘মানবতা’র নামে তৈরিই হয়েছে ‘মানুষের’ ওপর নজরদারি করার জন্য। সেক্ষেত্রে মানুষকে শোষণ করার জন্যই একটি সুন্দর তকমা সেঁটে দেওয়া হয় ‘মানবতাবাদের’ নামে। কিন্তু ক্ষমতা যেখানে বহুমাত্রিক সেখানে দ্বন্দ্বও ক্রিয়াশীল। ফলে মানবতাবাদী কীভাবে হওয়া সম্ভব সর্বস্তরে? কারণ শোষকের পক্ষে থাকলে শোষিতের পক্ষে থাকা সম্ভব নয়, আবার শোষিতের পক্ষে থাকলে শোষকের পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ‘মানবতাবাদী’ তকমাটি অন্তসার শূন্যতায় পরিণত হয়।

অন্যদিকে ‘মানবাধিকার’ বলতে ফুকো সমাজবিজ্ঞানের দিক থেকে যেটি বোঝাতে চেয়েছেন সেটি হলো, নাগরিক-অধিকার। নাগরিক হিসেবে একজন মানুষের অধিকার নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। যদিও দ্য অর্ডার অব থিংস বইতে আবার এ-ও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ক্ষমতা মানেই কর্তৃত্ববাদ। এমনকি জ্ঞানও ক্ষমতাবলয়ের জন্ম দেয়। তিনি মনে করতেন, ক্ষমতা ও জ্ঞান দুই বখে যাওয়া যমজ ভাই। যেমন- ক্ষমতা কীভাবে জ্ঞান তৈরি করে এবং জ্ঞান কীভাবে ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে, তা তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। আর ক্ষমতার মূল কেন্দ্র রাষ্ট্র, তো রাষ্ট্র যেখানে বড় ক্ষমতাধর, সেখানে নাগরিক-অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

আন্দ্রে গ্লুক্সমান ব্যক্তিগত জীবনে মিশেল ফুকোর বন্ধু ছিলেন।  তিনি ফুকোর মানবাধিকারের বিষয়ে বলেন : ‘কর্তা’ কোনো স্থায়ী অধিবিদ্যার সত্তা নয় বা সম্পূর্ণভাবে উপস্থিত কোনো ‘সাবজেক্টাম’ নয়; সে হচ্ছে ক্ষমতা ও জ্ঞানের পারস্পরিক সম্পর্কের এক দ্বন্দ্বমুখর ফলাফল। এটি এমন যে প্রতিনিয়ত গঠিত হচ্ছে আবার ভেঙেও পড়ছে। সে জন্য ফুকোর মানবাধিকার সবসময়ই নতুন নতুন প্রেক্ষাপটে রচিত হবে। এর কোনো লিখিত সনদের দরকার নেই। কারণ বিদ্যমান রাষ্ট্র বা আইনিব্যবস্থা নাগরিক-অধিকার পক্ষান্তরে মানবাধিকারের সৌন্দর্য সম্পর্কে ওয়াকিবহালই নয়। মানবাধিকার সবসময় নতুন নতুন দাবি উত্থাপন করবে। সেজন্য মানবাধিকারকে রাষ্ট্রের আধুনিক শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা মোকাবিলার একটি কৌশলগত হাতিয়ার (ঝঃৎধঃবমরপ ঞড়ড়ষ) হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

ফুকো জীবনের শেষদিকে রাষ্ট্র কর্তৃক মানুষের দুর্ভোগের জন্য বিভিন্ন লড়াইয়ের কথাও বলেছেন। তিনি ১৯৮১ সালে জাতিসংঘের একটি অধিবেশনে বক্তব্য দেন। এ বক্তব্যে তিনি ভিয়েতনামের রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান। ফুকোর এই ‘মানবতাবাদ’ ও ‘মানবাধিকার’ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ এরিক পারাস মনে করেন, মানবাধিকারের সঙ্গে সমালোচনামূলক সম্পৃক্ততা বজায় রেখেই একই সঙ্গে ‘মানবতাবাদের’ বিরোধিতা করা যায়। যেমন—প্রথমত ফুকোর দর্শনে ‘সাবজেক্টিভিটি’ বা ‘কর্তাসত্তা’ বিষয়ক নব্য মানবতাবাদী ব্যাখ্যার সারসংক্ষেপ ও তার সমালোচনা এবং দ্বিতীয়ত, ফুকোর অ-মানবতাবাদী অবস্থানের (যা সুসংগত এবং শেষ পর্যন্ত পরিত্যাগ করেননি) সঙ্গে মানবাধিকার বিষয়ক এক প্রথাবিরোধী চিন্তাধারার সংযোগ স্থাপন।

এরিক পারাস ২০০৬ সালে একটি বই লেখেন- যার নাম, ফুকো ২.০: বিয়ন্ড পাওয়ার অ্যান্ড নলেজ। এ বইতে পারাস বলেন : ‘দ্য বার্থ অব বায়োপলিটিক্স’ বিষয়ক বক্তৃতাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফুকো ‘উদারবাদ’কে পর্যালোচনার মাধ্যমে ‘কর্তা’ বা ‘সাবজেক্ট’কে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে শুরু করেন। সাবজেক্টিভিটি অ্যান্ড ট্রুথ এবং ‘দ্য হারমেনিউটিক অব দ্য সাবজেক্ট’ বক্তৃতা-মালায় ব্যক্তির আত্ম-গঠন ও নৈতিক সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ফুকো এমন এক ধারণার অবতারণা করেন যাকে ‘প্রাক-বয়ানমূলক সত্তা’ বা ‘ঢ়ৎব-ফরংপঁৎংরাব ংঁনলবপঃ’ বলে অভিহিতি করেন। এটি এমন এক ‘সত্তাগত কেন্দ্রবিন্দু’- যা স্বাধীনভাবেই নিজের পথ বেছে নেয়। যা আগে থেকে ধারাবাহিকভাবে মানুষের অধিকার রক্ষার সঙ্গে জড়িত নয়। কৌশলগত হাতিয়ার বা স্ট্র্যাটেজিক টুলস হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং অবশ্যই সেটা প্রতিবাদী, ভিন্নমাত্রার এবং ক্ষমতাবিরোধী। এই বিষয়টিই মানবাধিকার। এর বাইরে মানবতাবাদের অস্তিত্ব সুবিধাবাদিতা। এরিক পারাস এ বইয়ে এও জানান যে, মিশেল ফুকো তার জীবনের প্রথমদিকে ‘ক্ষমতা’ এবং ‘জ্ঞানের’ মধ্যকার সম্পর্ককে যেভাবে দেখতেন এবং যেভাবে এগুলো মানুষের মুক্ত ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করে; সেসব দার্শনিক অবস্থান থেকে পরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে নতুনভাবে তার চিন্তা প্রকাশ করেন। যেমন—ক্ষমতার মাইক্রোফিজিক্স বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রূপের আলোচনা থেকে বেশি গুরুত্ব দেন ব্যক্তির স্বাধীনতাকে এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নন্দনতত্ত্বের দিকে। আর সেসময়েই তিনি  ‘আলোকপ্রাপ্তি যুগের ঐতিহ্যের অনুসারি’ হয়ে পড়েন।

ফুকো দর্শনের যারা বিরোধিতা করেন তারা অনেকেই মনে করেন, ফুকো নিজেই তো একেক সময় একেক রকম কথা বলেছেন। নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকেননি। জবাবে ফুকোপ্রেমীরা বলেন, ফুকো নিজেই তো মানুষের সংজ্ঞা পাল্টানোর কথা বারবার বলেছেন এবং ধারাবাহিকতা রক্ষার বিরোধিতা করেছেন। যেমন হেগেলের যুক্তি ছিল ইতিহাসের সবকিছু দ্বন্দ্বের মাধ্যমে ক্রমে বিকশিত হয়, কিন্তু ফুকো বলেছেন, ক্রমোন্নতি বলতে কিছু নেই। যা আছে তা সভ্যতা ও চিন্তাশৈলীর শেষে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা ও খণ্ড খণ্ড চিত্র। অখণ্ডতা নেই। ফুকো জীবনের শেষের দিকে কয়েকটি প্রশ্ন রেখেছিলেন তার একটি বক্তৃতায়। প্রশ্নগুলো এমন, দর্শন যেখানে সত্য তুলে ধরে সেখানে দর্শন কি ক্ষমতার প্রেক্ষাপটকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে? দ্বিতীয়ত, কী ধরনের ক্ষমতা সত্যের আলোচনা উৎপাদন করতে পারে? তৃতীয়ত, ক্ষমতা কী ধরনের কর্তৃত্ব চালায় সত্যকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য? ফুকো বারবারই ক্ষমতা, জ্ঞান ও সম্পর্ককে প্রশ্ন করেছেন এবং মজার বিষয় তিনি নিজেও একটি নির্দিষ্ট বাউন্ডারি দিতে চাননি তার সৃষ্টিকর্মে। বরং নিজের তৈরি বাউন্ডারিও বারবার ভাঙতে গিয়েছেন। ফুকো এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, বুদ্ধিজীবীরা সব বিষয়েই কেমন যেন সিরিয়াস থাকতে চায়, যেমন খাবারের বিষয়ে। যে খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না সেটি যেন পছন্দ করা যাবে না। কিন্তু আমার বরাবরই পছন্দ ক্লাব-স্যান্ডোউইচ ও কোকাকোলা। তখন তাকে পাল্টা প্রশ্ন করা হয়, কোকাকোলা কোম্পানি তো বিশেষ ক্ষমতাপ্রভাবকারী। একটা কালচারেরই জন্ম দিয়েছে তারা। আপনি কেন সেটি পছন্দ করবেন? জবাবে ফুকো বলেছিলেন, রাষ্ট্র-ক্ষমতা-জ্ঞান উৎপাদনকারী সংস্থাকারীও একই রকম ক্ষতিকারক। আমি কি তাই বলে এ ব্যবস্থায় বেঁচে থাকব না? মরে যাব? দার্শনিক হিসেবে ফুকো তার ব্যতিক্রমী অবস্থানের জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছিলেন, এখনো আছেন। তার সমসাময়িকদের অনেকেই তাকে ‘খাপছাড়া’, ‘ক্ষ্যাপাটে’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

ইরানে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির (১৯৪১-১৯৭৯) দীর্ঘ শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ইরানি বিপ্লবও বলেন কেউ কেউ। ১৯৭৮ সালের শেষের দিকে সরকারবিরোধী এই গণআন্দোলনে যোগ দেন ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী, গণতন্ত্রকামী, বামপন্থিরাসহ সবস্তরের মানুষ। কিন্তু পরে দেখা যায়, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি গোষ্ঠী প্রধান হয়ে ওঠে ও ক্ষমতা দখল করে। সেই গণআন্দোলনের পক্ষ নিয়েছিলেন ফুকো। এ কারণে তিনি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। তার জীবনের সেরা ভুলও মনে করেন অনেকে। এ নিয়ে কাজ করেছেন জ্যানেট আফারি ও ক্যাভিন বি অ্যান্ডারসন। লেখার বিষয়, ‘ফুকো ও ইরানি বিপ্লবের পুনর্বিচার।’ এ লেখায় তারা তুলে ধরেন ফ্রান্স থেকে শুরু করে পুরো দুনিয়ার অধিকাংশ দার্শনিক, বুদ্ধিজীবীই ফুকোকে ‘সেরা বোকা’ অভিহিত করেছিলেন। ফুকোর জীবনীকারদেরও একজন লিখেছিলেন যে, ফুকোর ওই সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল সেটা তিনি পরে বুঝেছিলেন।

উত্তরাধুনিক অবস্থান থেকে ফুকো যুক্তি দেন, ‘শাহের ধর্মনিরপেক্ষকরণ ও আধুনিকীকরণের’ পরিকল্পনা তার বাবা মোহাম্মদ রেজা শাহের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। পাহলভি শাহরা ছিলেন নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার। আর তাই সেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠী অত্যাচারিত বোধ করেছে এবং এ গণআন্দোলনের দিকে গিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই বিপ্লবের আরেকটি চরিত্র ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, ফুকোর মুগ্ধতা সেখানেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি অন্ধ ছিলেন। কারণ ফুকো মোহাম্মদ রেজা শাহের শাসনব্যবস্থা এবং গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’-এর যেমন সমালোচনা করেছিলেন তেমনই এ-ও বলেছিলেন এই বিপ্লব যাতে বেহাত না হয়। সব ধরনের প্রান্তিক মানুষরা তাদের অধিকার ফিরে পাক। কিন্তু ১৯৭৯ সালে খোমেনি ক্ষমতা গ্রহণের পর সেই একই পত্রিকায় নিবন্ধ লিখেছিলেন যার শিরোনাম ছিল, ‘আ পাউডার কেগ কলড ইসলাম’। ফুকো সেখানে ইরানি বামপন্থিদের সমালোচনা করে বলেন, তারা সুন্দর স্লোগান দেন। তবে ক্ষমতা দখল কখনোই করতে পারেন না। ইরানের খোমেনি উত্তরাধিকারীদের পরিণতিও ভালো হবে না, এ ভবিষ্যদ্বাণীও তিনি তখনই করেছিলেন। তার মানে ফুকো এখানে ‘উদারনীতিবাদী শাসন ব্যবস্থা’র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।

ফুকো যে কোনো সম্পর্কের মধ্যকার ক্ষমতার সমীকরণকে শনাক্ত ও চ্যালেঞ্জ করতে পছন্দ করতেন। তিনি পশ্চিমা মর্ডানিটি ও তাদের প্রেসক্রিপশনের সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইরানি বিপ্লবকে ‘মজলুমের লড়াই’ হিসেবে দেখেছিলেন। সেসময়ই তিনি তার বিখ্যাত সেই উক্তি করেন- মানুষ যুদ্ধ করে জয়ের জন্য, ন্যায়ের জন্য নয়।

ফুকো যে কোনো ধারণা বা আচরণের বিশেষ প্রবণতা কীভাবে তৈরি হলো, এর শুরু কবে থেকে এবং ইতিহাসের কোন প্রেক্ষাপটে তা তৈরি হলো, এ নিয়ে সবসময়ই আগ্রহী ছিলেন এবং শনাক্ত করতেন। তিনি এই পদ্ধতির নাম দিয়েছিলেন জিনিওলজি। ডেভিড ম্যাসি জানান, ফুকো ইরানে শাহ পাভলভির আমল থেকে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে পাশ্চাত্যমুখী করার চেষ্টা চলছিল ও সভ্যতা বলতে পাশ্চাত্য সভ্যতাকেই বোঝানো হতো, সেটিকেও ভালোভাবে নিতে পারেননি।

ফুকোর মৃত্যুর আগে সম্ভবত শেষ আলাপচারিতায়, জেরাল্ড রুলেট তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘মার্কসবাদের দিন কি শেষ?’ ফুকো জবাব দেন, এটা স্পষ্ট, কেউ যদি মেনেও নেয় মার্কস আপাতত দৃশ্যপট থেকে সরে যাবেন, তবু তিনি কোনো না কোনো দিন আবার ফিরে আসবেন। অথচ তিনিই তো মার্কসবাদকে  একসময় ‘অর্থনৈতিকতায় ভারাক্রান্ত’ বলেছিলেন! ফুকো আসলে বারবারই বাউন্ডারি ভাঙার দার্শনিক ছিলেন।

কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

শরৎনগর স্টেশনে এক নারী
১৬ অক্টোবর ২০২৬

শরৎনগর স্টেশনে এক নারী

ছোটগল্প===

বিরহ কান্না
১৬ অক্টোবর ২০২৬

বিরহ কান্না

কবিতা===

মোঃ রহমত আলীর দুটি কবিতা
১৬ অক্টোবর ২০২৬

মোঃ রহমত আলীর দুটি কবিতা

মরা নদীর চেয়েও অনর্থক     পর্যাপ্ত জল নেই,কোনো ঢেউ নেই,নামমাত্র স্রোতও নেই।ঠিক ক...

মায়ার নিজস্ব ঋতু
১৬ অক্টোবর ২০২৬

মায়ার নিজস্ব ঋতু

লামিয়া হাসানকিছু বিকেল আসেকোনো কারণ ছাড়াই সুন্দর-জানালার কার্নিশে রোদ জমে থাকে,দূরের আকাশে মেঘেরা ভে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে