সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তাঁর এ বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হলে ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর। সংস্থাটির দাবি, আইন প্রয়োগে কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে আইজিপি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেননি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর চকবাজারের ওয়াটার ওয়ার্কার্স রোডের শাহজাহান ইমাম টাওয়ারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন আইজিপি। সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ার করার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমাদের দায়িত্ব, আইন-সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেইটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেইটা করব।”
পুলিশের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা (পুলিশ) যদি লাঠিপেটা করি, বলবেন আমরা ফ্যাসিস্ট পুলিশ। আর আমরা যদি নীরবে থাকি, তাহলে বলবেন দুর্বল পুলিশ। আমাকে তো কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে। এমপাওয়ার করতে হবে।”
আইন ও সংবিধান মেনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আইজিপি বলেন, “সুতরাং দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন, এটা স্বীকার করে নিয়ে আইন এবং সংবিধান অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন।” তিনি আরো বলেন, পুলিশের সদস্যরা অপরাধ করলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজরদারি ও ভারসাম্যব্যবস্থা রয়েছে। প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধান না করে মিথ্যা অভিযোগ ও গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
সাংবাদিকদের একাংশের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ তুলে আলী হোসেন ফকির বলেন, কোনো ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ না পেলে পুলিশকে অকার্যকর বলে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। তবে পুলিশ সদরদপ্তর পরে জানিয়েছে, সাংবাদিকদের সম্পর্কে আইজিপি ঢালাও মন্তব্য করতে চাননি; মন্তব্যটি অসাবধানতাবশত হয়েছে।
আইজিপি দাবি করেন, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করেনি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তি প্রয়োগ করেনি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশ সদস্যরা রাস্তায় দায়িত্ব পালনে ভয় পেতেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশকে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলা, জনগণকে স্বস্তি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেওয়া এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পুলিশ দিনরাত কাজ করছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের স্পষ্টীকরণে বলা হয়েছে, আইজিপি মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে পুলিশের দৃঢ় অঙ্গীকার তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রের প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে অপরাধ দমন, অপরাধী গ্রেফতার, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের কখনো অপরাধী, সংঘবদ্ধ হামলাকারী কিংবা আইন অমান্যকারীদের সরাসরি আক্রমণ ও প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয় বলেও উল্লেখ করেছে সদরদপ্তর।
পুলিশের ওপর ১০ মাসে ১৭৬ হামলা: পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধী গ্রেফতার, অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ ও সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় চারজন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
সদরদপ্তরের স্পষ্টীকরণে বলা হয়, প্রচলিত আইন, বিশেষ করে দণ্ডবিধি-১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ এবং পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১-এ পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে। মানবাধিকার সমুন্নত রেখে জনগণের জানমাল রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পেশাদারত্ব এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ পুলিশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আইজিপির বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) সরকারের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তা প্রত্যাহার, আইজিপির জবাবদিহি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত অবস্থানের পরিপন্থি বক্তব্যের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও শিরোনাম নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি দূর করতেই এ স্পষ্টীকরণ দেওয়া হয়েছে।
সানা/আপ্র/২৬/১০/২০২৬