সারা দেশে পেট্রোল পাম্পে তেলের সংকটের মধ্যে আবারো জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, তারা সংকট দেখছে না। এদিকে জ্বালানির তেলের দাম বাড়বে বলে গুঞ্জন উঠে। তবে, আপাতত দাম বাড়াচ্ছে না সরকার। এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জ্বালানি বিভাগ থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সচিবালয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার টন জ্বালানি তেল মজুদ আছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে জ্বালানি সংকটে পড়েছে প্রায় পুরো বিশ্ব। বাংলাদেশও জ্বালারি তেল পেতে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে তেল মজুদের খবর আসছে। সরকার মজুদদারি ঠেকাতে অভিযান চালাচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের অস্থিরতার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও অন্য উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টাও করছে সরকার। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট বিবেচনায় স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ‘অনলাইন ও সশরীরে’ দুই পদ্ধতিতেই ক্লাস নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তবে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হবে এবং সেখানেই সিদ্ধান্ত হবে বলেছেন তিনি।
দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে এদিন সংবাদ সম্মেলনে আসা জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব দাবি করেছেন, মার্চ মাসের মতো এপ্রিলেও জ্বালানি সরবরাহ করা যাবে, যে কারণে কোনো সমস্যা হবে না।
মজুদ কত? যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে বর্তমানে মোট ১ লাখ ৯২ হাজার ৯১৯ টন পেট্রোল, ডিজেল, অকেটেন ও জেট ফুয়েলের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল মজুদ হল, ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন ডিজেল মজুদ আছে। এছাড়া ৭ হাজার ৯৪০ টন অকটেন, ১১ হাজার ৪৩১ টন পেট্রোল ও জেট ফুয়েল মজুদ রয়েছে ৪৪ হাজার ৬০৯ টন। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার টন। মার্চ মাসে এলপিজি আমদানির হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৯৪ টন। এর আগে ২৭ মার্চ যশোরে এক অনুষ্ঠানে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশে প্রতিদিন গড়ে ডিজেলের চাহিদা ছিল ১২ হাজার টন, আর পেট্রোল-অকটেনে চাহিদা ছিল ১২০০ থেকে ১৪০০ টন।
সংকট নেই: জ্বালানির কোনো সংকট নেই দাবি করে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “আমরা মার্চ মাসেও আপনাদেরকে আশ্বস্ত করেছি যে আমাদের কোনো সংকট নেই। এপ্রিলের একদিন আগে দাঁড়িয়েও আমি বলছি আপনাকে ইনশাআল্লাহ কোনো অসুবিধা নেই। এই মুহূর্তে অ্যাভেইলেবল, যেটা আমি ব্যবহার করতে পারব সেটার কথাটা আমি বলেছি।
মনস্তাত্বিক কারণে পেট্রোল পাম্পে লাইন: পাম্পের দীর্ঘ লাইনের কারণ ক্রেতাদের মনস্তাত্বিক বিষয় বলে মনে করছেন যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, মার্চ মাসে (জ্বালানি তেল) যা দেওয়া হয়েছে তার থেকে কম দেওয়া হবে না। এপ্রিল মাসেও আমরা একই কথাই বলছি যে গত বছরের এপ্রিলে যা দেওয়া হয়েছে তার থেকে কম দেওয়া হবে না। মানুষ যদি স্বাভাবিক কেনাকাটা করে কোনো অসুবিধা ইনশল্লাহ হবে না।
অভিযানে ২ লাখ লিটার ডিজেল উদ্ধার: সারাদেশে অবৈধভাবে মজুদ করা জ্বালানি তেল উদ্ধার অভিযানে ১ হাজার ২৪৪ মামলায় ৮৪ লাখ ৫১ হাজার অর্থদণ্ড করা হয়েছে। কারাদণ্ড দয়া হয়েছে ১৯ ব্যক্তিকে।
অভিযানে ডিজেল উদ্ধার হয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ৩৬৫ লিটার ডিজেল, অকটেন উদ্ধার হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৮ লিটার, পেট্রোল উদ্ধার হয়েছে ৬০ লিটার।
জ্বালানি পাচার নিয়ে সরকার ‘কঠোর’: জ্বালানি তেল পাচার রোধে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “কোনো সংকট আমরা দেখছি না। ফলে পাচারের বিষয়টা থাকতে পারে, কিন্তু আমরা সেই সেরকম কোনোৃ আপনাদের পত্রিকায়ও কোনো রিপোর্ট ওভাবে দেখছি না। তো ফলে আমরা সজাগ আছি। সরকার সম্পূর্ণরূপে বর্ডারে নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে যে এটা যাতে (পাচার না হয়) নিশ্চিত করা হয়।
বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আনার চেষ্টা: বিশ্ব বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। ইরান যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এক সাংবাদিক জানতে চান, দাম নির্ধারণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না। জবাবে যুগ্ম সচিব বলেন, জ্বালানি সেক্টরে কোনো রকম সমস্যা যেন তৈরি না হয়, আমরা যাতে মানুষকে শান্তি দিতে পারি। আমাদের সাপ্লাই চেইনে যা যা করা দরকার যেটুকু ডিজেল প্রতিমাসে চাহিদা, যেটুকু অকটেন প্রতি মাসে চাহিদা, সেটা নিশ্চিত করতে কাজ করছি।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেল দুইভাবে কিনি-একটা হচ্ছে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি), একটা হচ্ছে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক অনেকেই হয়তো জিটুজিরটা ক্যানসেল করতে পারে, সেটাও আমরা মাথায় রেখেছি। এটার বিকল্প কি হতে পারে, সেভাবে আমরা কাজ করছি। অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত কমিটি ও ক্রয় কমিটিতে জ্বালানি বিভাগ থেকে বেশকিছু প্রস্তাব পাঠানোর কথা তুলে ধরে যুগ্ম সচিব বলেন, সেগুলো অনুমোদন হলে আমরা হয়তো যে যে উৎস থেকে পাওয়ার কথা সেগুলো পেয়ে যাব। আশা করছি, ইনশাল্লাহ অসুবিধা হবে না। আশা করছি আজকের মধ্যে, হয়তো এটা সন্ধ্যার মধ্যে জেনে যাবেন।
সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো হবে: জ্বালানি সংকটের শঙ্কায় বাসা থেকে অফিস করা, শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস নেওয়া, সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানোর বিষয়টি সরকারের ভাবনায় থাকার খবর এসেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের উপায় খুঁজতে সরকারি সংস্থাগুলোকে সুপারিশ দেওয়ার খবরও এসেছে সংবাদমাধ্যমে। জ্বালানি বিভাগের সংবাদ সম্মেলনে সুপারিশ দেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে যুগ্ম সচিব বলেন, আমরা কিন্তু জনগণকে সাশ্রয়ী হতে বলছি। তারপরে আপনারা যে কথাগুলো বলেছেন, এই কথাগুলো আমরা যার কাছ থেকে যখন পাচ্ছি, আমরা কিন্তু নোট নিচ্ছি। আমাদের ইন্টার্নাল ডিসকাশন কিন্তু হচ্ছে। হ্যাঁ (প্রস্তার দেওয়া), এটা যখনই ধরুন সবগুলো মন্ত্রণালয় মিলে সিদ্ধান্তটা চূড়ান্ত হবে, আপনারা জেনে যাবেন।
আপাতত বাড়ছে না দাম: চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ক্রমাগতভাবে বাড়ছে দাম। জ্বালানির এই অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে দেশেও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পাওয়া যাচ্ছে না জ্বালানি তেল। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির তেলের দাম বাড়বে বলে গুঞ্জন উঠে। তবে, আপাতত দাম বাড়াচ্ছে না সরকার। এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জ্বালানি বিভাগ থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। ওই বার্তায় বলা হয়, ‘জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা (সংশোধিত)’ অনুযায়ী ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা নির্ধারণ করে তা বহাল রাখা হয়েছে। নতুন এই মূল্য ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
এর আগে, মঙ্গলবার সকালে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নতুন দাম ঘোষণা হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছিলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
সানা/আপ্র/৩১/৩/২০২৬