দেশের বাজারে আবারো মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বাড়তে শুরু করেছে। ভোজ্যতেল, সবজি, রান্নার গ্যাস, পরিবহনসহ প্রায় সব খাতে নতুন করে ব্যয়চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দামে ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী চাপ দেখা দিচ্ছে। এতে আয় অপরিবর্তিত থাকলেও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ আরো তীব্র হচ্ছে।
ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা: সাম্প্রতিক সময়ে খোলা ভোজ্যতেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে পাম অয়েল ও সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৭ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাইকারি বাজারে প্রতি ড্রামে প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ায় এর সরাসরি প্রভাব খুচরা পর্যায়ে পড়েছে। ফলে ভোক্তাদের বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বাড়ছে।
এলপিজি গ্যাসে বড় মূল্যবৃদ্ধি: রান্নার গ্যাস এলপিজির দামে বড় ধরনের বৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এপ্রিল মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। আগের মাসে এর দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বেড়েছে।
নতুন দরে প্রতি কেজি এলপিজির দাম দাঁড়িয়েছে ১৪৪ টাকা ৪ পয়সা। একই সঙ্গে অটোগ্যাসের দামও বেড়ে লিটারপ্রতি ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় প্রায় ১৮ টাকা বেশি। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভোক্তাদের অভিযোগ রয়েছে।
আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি: অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কমেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের আয়ও হ্রাস পাচ্ছে। একই সময়ে খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
পরিবহন খাতে জ্বালানি সংকটের কারণে যানবাহন চলাচল কমে যাওয়ায় চালক, হেলপার ও রাইড শেয়ারিং সংশ্লিষ্টদের আয়ও কমেছে। সীমিত পরিবহন চলাচলের কারণে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও উঠছে।
উৎপাদন ও সরবরাহে চাপ: জ্বালানি ঘাটতির কারণে শিল্প ও উৎপাদন খাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক কারখানায় বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজারে পণ্যের দামও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কৃষি খাতে ঝুঁকি: ডিজেল সংকটের প্রভাবে কৃষি খাতেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেচ ব্যবস্থায় ডিজেলের ওপর নির্ভরতা থাকায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এতে খাদ্য সরবরাহ ও বাজারের দামের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব: গবেষণা সংস্থার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। দেশটি প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানির জন্য আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক দামের ওঠানামা সরাসরি অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ: অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়ছে। বৈদেশিক ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপের মধ্যে নতুন ব্যয় বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে। তাদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজারে দ্বিতীয় ধাপের মূল্যস্ফীতি তৈরি হতে পারে, যেখানে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার পর তা খাদ্য ও সেবার দামে প্রতিফলিত হবে।
সংকট মোকাবিলায় করণীয়: অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং উৎপাদন খাত সচল রাখাই এখন মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
সানা/আপ্র/৪/৪/২০২৬