টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাসহ ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের রোববার (১২ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার সর্বশেষ হিসাবে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাত জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ মানুষ। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮ পরিবারের সদস্য।
দুর্গত মানুষের আশ্রয়ের জন্য খোলা হয়েছে ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ।
বেশি প্রাণহানি কক্সবাজারে: জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। সেখানে বন্যা ও পাহাড়ধসে মারা গেছেন ২৮ জন। নিহতদের মধ্যে ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। জেলায় আহত হয়েছেন ২৪ জন এবং এখনো একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
চট্টগ্রামে মারা গেছেন ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে একজন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধু চট্টগ্রাম বিভাগেই বন্যায় প্রাণহানি হয়েছে ৫০ জনের। বিভাগের ১১ জেলার ৪০৮টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যার কবলে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭৯ হাজার ১৮৭টি বসতঘর, ৩৪৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৩ হাজার ৮৪০ কিলোমিটার সড়ক এবং ৩৩৯টি সেতু ও কালভার্ট।
চট্টগ্রাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত: ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম জেলা। জেলার ১৬টি উপজেলায় প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানিবন্দি রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ পরিবার।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২২ হাজার ৬০০ মানুষ চট্টগ্রামের ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
কক্সবাজারে ১ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে ৪৮ হাজার ৬৩টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবানে ১৫ হাজার ৩৩০টি, চট্টগ্রামে ১৪ হাজার ২৮১টি, রাঙামাটিতে ৪৭৩টি এবং খাগড়াছড়িতে ১ হাজার ৪০টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পানির নিচে সড়ক, বিচ্ছিন্ন জনপদ: বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়কের সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের বুড়ির দোকান এলাকা। এতে ব্যাহত হয়েছে যান চলাচল। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে রয়েছে।
অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও রান্নার জ্বালানির সংকটে পড়েছেন দুর্গত মানুষ। বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র, আত্মীয়ের বাড়ি কিংবা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বাহারছড়া, শেখেরখীল, কাথারিয়া, বড়ইতলী, গণ্ডামারা, ডোমরা, কদমরসূল, খানখানাবাদ, চাম্বল, ছনুয়া, সরল, রায়ছাটা ও পুঁইছড়ি এলাকায় পানির ক্ষতি ব্যাপক।
শেখেরখীল ইউনিয়নের বাসিন্দা রিনা আক্তার বলেন, পাহাড়ি ঢলে তাদের পাঁচ কক্ষের মাটির ঘর পুরোপুরি ধসে গেছে। সন্তানদের নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছাড়তে হয়েছে।
শিশুসহ বহু মানুষের মৃত্যু: বন্যার ভয়াল স্রোতে প্রাণ হারিয়েছে শিশুরাও। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢলে ভেসে মারা গেছে ৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আশিক ও ৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ মিরাজ।
কক্সবাজারের পেকুয়ায় বানের পানির প্রবল স্রোতে ভেসে মারা গেছে ১৯ মাস বয়সী শিশু মুশফিকুর রহিম। শনিবার রাতে সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া কক্সবাজারে পাহাড়ধসেও প্রাণহানি ঘটেছে। টেকনাফে পাহাড় থেকে পড়ে আহত হওয়া একটি মা হাতিরও মৃত্যু হয়েছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ক্ষতি: বন্যায় শুধু মানুষের জীবন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি ও মৎস্য খাতও। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জেলায় ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টরের বেশি ফসল আক্রান্ত হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমির ফসল এখনো পানির নিচে রয়েছে।
আউশ ধান, আমন বীজতলা, পাট, গ্রীষ্মকালীন সবজি, মরিচ, আদা, হলুদ ও ফলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রামে ১৫ উপজেলার ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি এবং ৩২০টি চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জলাশয়ের মাছচাষ ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের ৬৪ জেলার জন্য ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগে বিভিন্ন জেলায় ৯২৩ মেট্রিক টন চাল, ৭ হাজার ২৮১ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
তবে দুর্গত এলাকার অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। অনেক পরিবার শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে।
নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে: বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেও বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী, চট্টগ্রামের সাঙ্গু, মৌলভীবাজারের মনু, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কুশিয়ারা এবং নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে।
আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে ফেনী, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে, বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকায় সাময়িক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীতে ফের জলাবদ্ধতা: বন্যার ধকল কাটতে না কাটতেই নতুন করে ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৩৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
চকবাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, বাকলিয়াসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় সড়কে পানি জমে যায়। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, সোমবার থেকে ভারী বৃষ্টির প্রবণতা কমতে পারে। তবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে গভীর নিম্নচাপের প্রভাব কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরের জন্য জারি করা স্থানীয় সতর্ক সংকেত প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পাশে পাকিস্তান: বাংলাদেশে বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ।
রোববার এক শোকবার্তায় তিনি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ভয়াবহ এই দুর্যোগে সৃষ্ট প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত।
তিনি আহতদের দ্রুত আরোগ্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা কামনা করেন। সূত্র: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসন, আবহাওয়া অধিদপ্তর
সানা/আপ্র/১২/৭/২০২৬