দেশের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে চাকরির প্রতিযোগিতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। সরকারি এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইনে প্রকাশিত চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে একটি পদের জন্য গড়ে আবেদন করছেন ২৮৭ জন চাকরিপ্রার্থী। কোভিড মহামারীর আগে এই সংখ্যা ছিল ১৭৩ জনের কিছু বেশি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, কোভিড মহামারীর ধাক্কা দেশের শ্রমবাজার থেকে এখনো পুরোপুরি কাটেনি। প্রতি বছর চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সেই হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় আনুষ্ঠানিক চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএসের সম্মেলন কক্ষে ‘লেবার মার্কেট টাইটনেস অ্যান্ড অ্যাগ্রিগেট শকস: এভিডেন্স ফ্রম বাংলাদেশের বৃহত্তম অনলাইন জব পোর্টাল’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
মহামারীতে চাকরির বাজারে বড় ধাক্কা
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুন সময়ে অনলাইনে চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ৭০ দশমিক ২ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে শূন্য পদের সংখ্যা কমে ৭৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে।
অন্যদিকে চাকরিপ্রার্থীর আবেদন কমে মাত্র ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে প্রতি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮৭ দশমিক ৩ জনে, যা পুরো গবেষণা সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশ
গবেষণায় উচ্চ আয়ের দেশের পরিস্থিতির সঙ্গেও বাংলাদেশের তুলনা করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে শূন্য পদ কমেছিল প্রায় ৪০ শতাংশ, আর যুক্তরাজ্যে কমেছিল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিয়োগ কমার হার তুলনামূলকভাবে আরও বেশি ছিল।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো রয়ে গেছে
গবেষণাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক অতনু রব্বানী। ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৪৭ সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
শুধু বিডিজবস-এর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, শূন্য পদ, চাকরির আবেদন এবং প্রতি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করে আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘লকডাউন’-এর প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী। প্রথম সপ্তাহেই চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে যায়। তিন মাস পর এই চাপ ২৯ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছে যায় এবং প্রায় নয় মাস ধরে উচ্চ পর্যায়ে বজায় থাকে। বাজারকে স্বাভাবিক প্রবণতায় ফিরতে সময় লাগে প্রায় ৪১ সপ্তাহ।
এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি বাজার
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্তও চাকরির বাজার পুরোপুরি মহামারী-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে পারেনি। এই সময়ে প্রতি পদের বিপরীতে আবেদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গড়ে ২১ শতাংশ বেশি ছিল।
তবে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, এই বিশ্লেষণ শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারকে প্রতিফলিত করে। অথচ দেশের ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশ মানুষ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত।
সুদহার পরিবর্তনের প্রভাব সীমিত
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার পরিবর্তন চাকরির বাজারে খুব সীমিত প্রভাব ফেলেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে দেখা গেছে, সুদহারের পরিবর্তন চাকরির বিজ্ঞপ্তির মাত্র ৬ শতাংশ পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারে। অর্থাৎ বড় ধরনের আকস্মিক সংকটের তুলনায় ধীরগতির মুদ্রানীতির প্রভাব অনলাইন চাকরির বাজারে তুলনামূলকভাবে কম।
দ্রুত সংকেত দিতে পারে অনলাইন তথ্য
গবেষক অতনু রব্বানী বলেন, প্রচলিত শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য প্রকাশে কয়েক মাস সময় লাগে। ফলে আকস্মিক সংকট দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়। কিন্তু অনলাইন জব পোর্টালের তথ্য ব্যবহার করলে কয়েক দিনের মধ্যেই শ্রমবাজারের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, অনলাইন চাকরির তথ্য নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি চাকরি হারানো আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য আরও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর জোর প্রতিমন্ত্রীর
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্র, কর্মসংস্থানের অবস্থা এবং নীতির প্রভাব নিয়মিত মূল্যায়নে নির্ভরযোগ্য তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় নীতিগত সংশোধন সম্ভব।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা চলছে, যাতে কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়।
সানা/আপ্র/৩১/৭/২০২৬