আগামী ১০ বছরের জন্য দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনর্গঠন করে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি ও যানবাহনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। কয়েক হাজার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি একপর্যায়ে জনসমাবেশে রূপ নেয়।
চলমান জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন অপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছে। জনগণের স্বার্থে এ খাতকে নতুন করে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। সরকার ইতোমধ্যে এ কাজ শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ১০ বছরে দেশের জ্বালানি পরিকল্পনা কী হবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে, সেই প্রস্তাবনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনার ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হবে, যাতে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মিল-কারখানা ও বাসাবাড়িতে মানুষ প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পায় এবং গাড়ি ও মোটরসাইকেলের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।
জ্বালানি সংকট নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তুলে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সম্প্রতি কিছু মানুষ এ বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। কারও নিজস্ব পরিকল্পনা থাকলে তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা জনগণের শান্তি নষ্ট করা যাবে না।
তারেক রহমান বলেন, এখন দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সময়। দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও ভাগ্যের পরিবর্তনই সরকারের লক্ষ্য। স্বাধীনতার পর অনেক দেশ বাংলাদেশের পরে স্বাধীন হয়ে কাজ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অনেক দূর এগিয়ে গেছে; বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকতে পারে না।
দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো এলাকায় অস্থিরতা বা গণ্ডগোল হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ছোট দোকানি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। একইভাবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও শিল্পকারখানার উৎপাদিত পণ্য বন্দরে নেওয়া এবং কাঁচামাল আনার ক্ষেত্রে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ চান।
শিল্পকারখানা সঠিকভাবে পরিচালনা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। যারা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করতে চায় এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে না পারলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের বই দেওয়া কিংবা অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হবে। তাই দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া হবে, নাকি ঝগড়া-বিবাদ ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে থাকা হবে-সেই সিদ্ধান্ত জনগণকেই নিতে হবে।
বিগত স্বৈরাচার আমলে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল অভিযোগ করে তারেক রহমান বলেন, তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এমন কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, যা দেশের মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আনোয়ারায় চীনের জন্য বড় একটি শিল্পাঞ্চলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে কয়েকশ মিল-কারখানা গড়ে উঠবে এবং চট্টগ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
বাঁশখালীর লবণচাষিদের বিভিন্ন দাবির বিষয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, শুধু ধান, পাট, শাকসবজি বা অন্যান্য ফসলের চাষিরাই কৃষক কার্ড পাবেন না; লবণচাষিরাও কৃষক কার্ডের আওতায় আসবেন। লবণের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের দাবির বিষয়েও ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, লবণের এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে চাষিরা স্বাবলম্বী হতে পারেন এবং অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হন। আগামী কিছুদিনের মধ্যে নির্ধারিত মূল্য সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সমাবেশে বাঁশখালী উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। চলতি অর্থবছরে সারাদেশের প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের মায়েদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বাঁশখালী এলাকায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবারের হাতে এ কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে সকালে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে যান প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে গুলশানের বাসা থেকে বের হয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে যান তিনি। সেখান থেকে সকাল সোয়া ৯টার দিকে হেলিকপ্টারে মাতারবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হন। বেলা পৌনে ১১টার দিকে তার হেলিকপ্টার সেখানে পৌঁছায়।
মাতারবাড়ীতে প্রধানমন্ত্রী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। পরে হেলিকপ্টারে বাঁশখালীর বাহারছড়ায় গিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে ত্রাণসামগ্রী ও নতুন টিনের ঘরের চাবি তুলে দেন।
সফরসূচি অনুযায়ী, পরে ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করেন। এরপর হাটহাজারীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এবং সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের একটি হোটেলে আয়োজিত সাংগঠনিক সভায় যোগ দেওয়ার কর্মসূচি ছিল তাঁর।
সানা/এসি/আপ্র/০৯/০৮/২০২৬