গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

মিথ্যার বাহাদুরি সত্যের আহাজারি

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:১৮ পিএম, ২০ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১২:২০ এএম ২০২৬
মিথ্যার বাহাদুরি সত্যের আহাজারি
ছবি

ছবি সংগৃহীত

মো. সিরাজুল ইসলাম মোল্লা    

কী অদ্ভুত দেশ আমাদের! কী বিচিত্র মানুষের মন! কত সস্তায়, কত সহজে এ দেশের মানুষ মিথ্যা, কুমন্ত্রণা ও অপপ্রচারের জালে আটকা পড়ে মিথ্যাকে সত্য বলে জানে! তাদের সামনে সত্যকে মেলে ধরতে কত যে কসরত করতে হয়, তা বলে শেষ করা যাবে না! সত্যকে ছেড়ে মিথ্যার নিচে সমবেত হওয়ার মতো এমন শঙ্কর জনগোষ্ঠী পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল!

আমার জন্ম ১৯৫৭ সালে। সেই সূত্রে আমার প্রজন্মের মতো আমিও ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ১৯৭১ সালে বাঙালিদের ওপর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা, হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ আমি স্বচক্ষে দেখেছি। দেখেছি মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে সত্যকে ঢাকার কী উদগ্র বাসনা ও প্রচেষ্টা। মানুষের প্রতি মানুষের সেই ভয়ঙ্কর বর্বরতা এমন এক গভীর কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, যার জুড়ি মেলা ভার! নারী, শিশু, বৃদ্ধ—কেউই সেই নৃশংসতা থেকে রক্ষা পায়নি। জাতিগত বিদ্বেষ ও ক্ষমতার উন্মত্ততা কীভাবে একটি রাষ্ট্রকে অমানবিকতার চূড়ায় পৌঁছে দিতে পারে, ১৯৭১ সাল তার জ্বলন্ত উদাহরণ। অথচ সবকিছুকে ‘কিছুই হয়নি’ এবং ‘অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা’ বলে জান্তা সরকারের প্রচারণা ছিল চরম মিথ্যাচার ও ভণ্ডামিতে পূর্ণ।

স্বাধীনতার পর ভেবেছিলাম, একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে সত্যের ওপর ভর করে আমরা মাথা উঁচু করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধর্ম-বর্ণ-গোত্রনির্বিশেষে সবাই দেশ গড়ার কাজে শামিল হব, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব, আমাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না! কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়, মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতার রূপকারকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও সেই মিথ্যার কোপানলে পড়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্মমভাবে জীবন দিতে হলো। অস্ত্রধারীরা কেড়ে নিল রাষ্ট্র, আর মানুষ তাদের ভাগ্য মেনে নিতে বাধ্য হলো। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস—মাত্র ছয় বছরের মাথায় নির্মমভাবে নিহত হলেন সেই অস্ত্রধারীদের প্রতিনিধি শাসক, যিনি অবশ্য পরবর্তীকালে গণতান্ত্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। কাউন্টার অ্যাটাকে নিহত হলেন অনেক অস্ত্রধারী এবং ক্ষমতায় এলেন আরেক অস্ত্রধারী। তিনি একনাগাড়ে নয় বছর শাসন করলেন। তাকে সরাতে পুনরায় রক্ত ঝরাতে হলো, এককাট্টা হতে হলো দেশের সব রাজনৈতিক দলকে- যারা তখন দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করত। তারপর মোটামুটি একটি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরল দেশ! ক্ষমতায় এলো নিহত রাষ্ট্রপতির তৈরি দল।

মানুষ একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সুস্থ ধারায় দেশ ফিরল বুঝি- এমনটা মনে করে! কিন্তু না, আবার সেই দুঃশাসন। জেঁকে বসল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দল। মিথ্যার ফুলঝুরি দিয়ে সাজানো হলো ছোটদের পাঠ্যবই, ইতিহাস। করা হলো ক্ষমতায় টিকে থাকার সব ফন্দি-ফিকির। পুনরায় মানুষ বাধ্য করল তাদের ক্ষমতা থেকে সরে যেতে। নতুন নির্বাচন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এলো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল। মিথ্যাকে সরিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে পুনরায় মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে করে ফেলল বাড়াবাড়ি। তবে পাঁচ বছর পর সুশৃঙ্খলভাবে ক্ষমতার পালাবদল হলো। কিন্তু সত্য ইতিহাসের ওপর পুনরায় চালানো হলো ক্ষুর। মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো সত্যকে এবং ক্ষমতাসীনরা পুনরায় ক্ষমতায় জেঁকে বসার উলঙ্গ প্রচেষ্টায় লিপ্ত হলো। আবার আন্দোলন-সংগ্রাম, আবার অস্ত্রধারীদের আগমন এবং মিথ্যার জয়জয়কার!

অবশেষে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকার দুই বছর পর পুনরায় গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা। তারপর একনাগাড়ে এক পক্ষের ষোলো বছরের শাসন। আবার মিথ্যাকে মুছতে গিয়ে মিথ্যারই আশ্রয়ে সত্যের প্রচণ্ড রকমের বাড়াবাড়ি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, একগুঁয়েমি এবং একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার। কান পাতেনি তারা দেয়ালে, শোনেনি গণমানুষের কথা! আত্মম্ভরিতার ঠেলায় মানুষকে বোঝানোর চেষ্টাটাও করেনি তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কতটুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা। সুতরাং আর যায় কোথায়! পড়ে গেল তারা এক ভয়ঙ্কর ব্ল্যাক হোলে!

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছে, সত্যের ওপর ভর করে ২০২৪-এ মিথ্যার করিডোর থেকে বের হয়ে এসেছে দেশ, কিন্তু বাস্তবে মিথ্যার কাছেই পুনরায় পরাজিত হলো মানুষ, পরাজিত হলো দেশ! মানবতার ওপরও নেমে এলো এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়! বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী মহামানবের (!) দেড় বছরের শাসনকালে তা ভালোভাবেই আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশের মানুষ!

সত্যের বিরুদ্ধে মিথ্যার ষড়যন্ত্র, নোংরামি আর সত্যের ওপর মিথ্যার ক্রমাগত হামলা এবং মিথ্যার কুমির দ্বারা সত্যকে গিলে খাওয়ার প্রবণতা শুধু যে আমাদের দেশে, তা কিন্তু নয়! পৃথিবীব্যাপী রয়েছে এর প্রচণ্ড দাপট! অনেক আগের ইতিহাসের দিকে নজর না-ই বা দিলাম। কিছুদিন আগের দিকে একটু ফিরে তাকাই!

গত কয়েক দশকে আমরা বিশ্ব রাজনীতির এক অস্থির ও নির্মম রূপ প্রত্যক্ষ করেছি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও আগ্রাসনের ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি ইরাকের পতন, লিবিয়ার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এবং সিরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও এর পরিণতি। এর সবকিছুই ঘটেছে মূলত মিথ্যার দানবের মারণাস্ত্রের আঘাতে। কোটি কোটি মানুষের জীবন সেখানে বিপর্যস্ত হয়েছে। আর এর প্রভাব পড়েছে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে! একটি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এর প্রভাব কেবল ওই দেশের সীমারেখায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন ও মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে।

সম্প্রতি গাজায় যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তা মানবসভ্যতার বিবেককে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। অসংখ্য নিরীহ মানুষের মৃত্যু, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- যুদ্ধ কখনো প্রকৃত সমাধান নয়। বরং তা আরও ঘৃণা, প্রতিশোধ ও অনিশ্চয়তার জন্ম দেয় এবং সর্বোপরি মিথ্যার আগুনে ঘি ঢেলে সহিংসতার বিস্তৃতি ঘটে!

একদিকে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না, অন্যদিকে আবার আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপট হয়ে উঠছে ইরানের ওপর আমেরিকা-ইসরায়েলের অতর্কিত আক্রমণের ফলে সৃষ্ট যুদ্ধ। মিথ্যা অজুহাতে ইরানকে কেন্দ্র করে যে সামরিক সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশ্ববাসীর উদ্বেগ শুধু নামকাওয়াস্তেই বাড়ায়নি, বরং বিশ্বে এক চরম রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অস্থিরতার ঢেউ আছড়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে! একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ওপর বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্র রাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে যে জঘন্য পেশিশক্তি প্রদর্শন করছে, তা কেবল সেই মেষশাবক ও নেকড়ের গল্পকেই মনে করিয়ে দেয়।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্যই ছিল যুদ্ধ ও আগ্রাসন প্রতিরোধ করা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করা। কিন্তু যখন শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে সেই কাঠামোকে উপেক্ষা করে, তখন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বৈশ্বিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তবু আশার জায়গা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি।

ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে, মানবতা বহু সংকটের মধ্য দিয়েও এগিয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ এখনো শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সহাবস্থানের পক্ষে কথা বলে। বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকারকর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব হলো সত্যকে তুলে ধরা এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবতার কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা।

আমাদের সবার মনে রাখা দরকার যে, অত্যাচার ও অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয় না! মিথ্যা দিয়ে সত্যকে কখনো হত্যা করা যায় না! সত্য একসময় মানুষের সামনে এসে দাঁড়াবেই! সেই উপলব্ধি থেকে আমাদেরও উচিত সত্যকে আঁকড়ে ধরা, সত্যের পক্ষে আওয়াজ জোরালো করা, সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলা, চুপের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা এবং মানবতা ও শান্তির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। মিথ্যার বাহাদুরি ও সত্যের আহাজারি যেন আর কখনো আমাদের দেখতে না হয়।

লেখক: প্রেসিডেন্ট, সুন্দর জীবন ও ফরমার ম্যানেজিং এডিটর, জেএইচপিএন আইসিডিডিআরবি
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/২০.০৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

বিচারপ্রবণ বা দোষ সন্ধানী মানসিকতা, ন্যায় বিচারের পথে অন্তরায়
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিচারপ্রবণ বা দোষ সন্ধানী মানসিকতা, ন্যায় বিচারের পথে অন্তরায়

ব্যারিস্টার পল্লব আচার্যপেশাগত, সামাজিক, পারিবারিক, বংশগত বা ব্যক্তিগত অবস্থানের ভিত্তিতে প্রত্যেক ম...

এশিয়ান গেমসে প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এশিয়ান গেমসে প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

জাহিদ রহমানপ্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঝটপট কিছু করার চেয়ে যে কোনো কিছু সঠিক পরিকল্পনায় করতে বেশি উৎসা...

আরও বিশ্ববিদ্যালয় কেন, কার স্বার্থে?
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আরও বিশ্ববিদ্যালয় কেন, কার স্বার্থে?

খায়ের মাহমুদবাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনার চেয়ে যেন রাজনৈতিক মর্যাদা, আ...

সম্পত্তি হস্তান্তরের আইন: কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সম্পত্তি হস্তান্তরের আইন: কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরসম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইনের গেজেটেও প্রকাশি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই