গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

মেনু

গণরায়ের ম্যান্ডেট ও রাষ্ট্রসংস্কারের অনিবার্যতা

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬:৪৭ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৮:০৯ এএম ২০২৬
গণরায়ের ম্যান্ডেট ও রাষ্ট্রসংস্কারের অনিবার্যতা
ছবি

জাতীয় সংসদ ভবন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের আকাঙক্ষা প্রকাশিত হয়েছিল, এই নির্বাচনে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। বেসরকারি ফলাফলে ২৯৭টি ঘোষিত আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে দলটির জন্য ঐতিহাসিক; তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো-এই বিজয় একটি গভীর রাজনৈতিক প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ।

বিজয়ের পর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বার্তা দিয়েছেন-আইনের সমান প্রয়োগ, প্রতিশোধপরায়ণতা পরিহার, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা-তা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি কার্যকর নীতি-পরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। একই সঙ্গে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশকারী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ফলাফল মেনে নিয়ে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিয়েছে। গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষায় এ অবস্থান ইতিবাচক। তবে অভিজ্ঞতা বলে, বক্তব্য ও বাস্তবতার ব্যবধান কমানোই হবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। প্রধানত যে চ্যালেঞ্জগুলো নতুন সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে, তা হলো-

প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন; আস্থার সংকট নিরসন: দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত-বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পেশাদারিত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দলীয় প্রভাবমুক্ত নিয়োগপ্রক্রিয়া, স্বচ্ছ পদোন্নতি নীতিমালা এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যকর নজরদারি-এসব পদক্ষেপ ছাড়া জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না। সংসদকে কার্যকর বিতর্ক ও আইন প্রণয়নের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে; নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য পুনর্গঠন জরুরি।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কাঠামোগত সংস্কার: উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতায় অর্থনীতি এখন চাপের মুখে। কেবল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ নয়, প্রয়োজন রাজস্ব কাঠামোর সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোরতা। রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ ও প্রকল্প অনুমোদনের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়-সাশ্রয়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে স্বচ্ছতা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রণোদনা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও বৈদেশিক শ্রমবাজারে মানসম্মত প্রস্তুতি অপরিহার্য। ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলোর অর্থায়ন-উৎস স্পষ্ট না হলে আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।

আইনের শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি: নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সহিংসতা এড়ানো এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করা সরকারের প্রথম পরীক্ষা। আইন সমানভাবে প্রয়োগের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন-দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিচার, মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। অতীতের অভিযোগসমূহ মোকাবিলায় একটি স্বাধীন সত্য-অনুসন্ধান বা পুনর্মিলন কমিশন গঠনের বিষয়ও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচননির্ভর নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সক্রিয় নাগরিক সমাজ-এই তিনটি স্তম্ভের ওপর গণতান্ত্রিক স্থিতি দাঁড়িয়ে থাকে। বিরোধী মতকে প্রতিপক্ষ নয়, নীতিগত পর্যালোচনার অংশ হিসেবে গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য ও স্বার্থসচেতনতা: আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অপরিহার্য। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। পররাষ্ট্রনীতিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার না বানিয়ে জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সুশাসনের মানদণ্ড হোক প্রতিশ্রুতি থেকে প্রয়োগে: নির্বাচনী ইশতেহার, ৩১ দফা কিংবা রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা-এসব কেবল রাজনৈতিক দলিল নয়; এগুলো এখন জনআকাঙক্ষার মাপকাঠি। প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ এবং নাগরিক পরামর্শ প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে। ডিজিটাল স্বচ্ছতা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয়, সরকারি ক্রয় ও নীতি বাস্তবায়নের তথ্য উন্মুক্ত করলে জনআস্থা বাড়বে।

জনপ্রত্যাশা সুশাসনের দৃশ্যমান প্রমাণ: গণরায় স্পষ্ট করে দিয়েছে-দেশ পরিবর্তন চায়। কিন্তু পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি শাসনদর্শনের রূপান্তর। পরিবর্তন হতে হবে নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ভিত্তিতে। তবেই এই বিজয় ঐতিহাসিক হয়ে উঠবে। নতুন সরকারের সামনে সুযোগ এসেছে রাষ্ট্রকে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে পুনর্গঠনের, রাজনীতিকে নীতি-নির্ভর ধারায় ফিরিয়ে আনার এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর। অর্থনৈতিক স্থিতি, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি-এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে পারে জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ। 
জনতার এই ম্যান্ডেটকে যদি দলীয় বিজয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় পুনর্গঠনের অঙ্গীকারে রূপ দেওয়া যায়, তবেই গণতন্ত্র সুস্থ ধারায় প্রবাহিত হবে।
অতএব, এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব-উৎসবের আবহ থেকে দ্রুত নীতির বাস্তবায়নে যাওয়া। জনগণ এবার ফল দেখতে চায়; প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি নয়, সুশাসনের দৃশ্যমান প্রমাণ। 
লেখক: সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

 

সংশ্লিষ্ট খবর

কাপাসিয়ার রক্তে রঞ্জিত পরিবারের প্রশ্ন- মানুষ কেন আপনজনের খুনি হয়
১৩ মে ২০২৬

কাপাসিয়ার রক্তে রঞ্জিত পরিবারের প্রশ্ন- মানুষ কেন আপনজনের খুনি হয়

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা আমাদের সময়ের এক ভয়াবহ সামাজিক দ...

সুশাসনের স্বপ্নে এক মানবিক বাংলাদেশ
১০ মে ২০২৬

সুশাসনের স্বপ্নে এক মানবিক বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই ভূখণ্ডের জন্মই হয়েছে সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আ...

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব
১০ মে ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব

আব্দুর রহমান পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বড় জয় পেয়েছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভা...

স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা জাতীয় ঐক্যের অন্তরায়
০৯ মে ২০২৬

স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা জাতীয় ঐক্যের অন্তরায়

মনজুরুল আলম মুকুলস্বাধীনতার পর দেশে অনেক গণআন্দোলন হয়েছে। বন্দুকের নলের সামনে আগে কাউকে কখনও এমন বুক...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

গ্রামীণ ব্যাংকের উচ্চ সুদহার নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে হাইকোর্টের রুল জারি

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট। আপনি কি মনে করেন- গ্রামীণ ব্যাংক সবচেয়ে চড়া সুদ আদায় করে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 14 ঘন্টা আগে