গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

মেনু

হাওরে ফসলহানির ঢেউ কি লাগবে চালের দামে?

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৩৪ পিএম, ০৬ মে ২০২৬ | আপডেট: ০৭:৫৩ এএম ২০২৬
হাওরে ফসলহানির ঢেউ কি লাগবে চালের দামে?
ছবি

ছবি সংগৃহীত

হাসান হামিদ    

হাওরের আকাশে আজ রোদ উঠলেও কৃষকের চোখে এখনো অন্ধকার। এপ্রিলের শেষ ভাগে এসে যে বোরো মৌসুমে আশার আলো জ্বলেছিল, তা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, উজানের ঢল আর নদীর ফুলে ওঠা পানিতে আবারও অনিশ্চয়তার অতলে তলিয়ে গেছে। হাওরাঞ্চলে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ধান তলিয়ে যাওয়ার খবর শুধু একটি অঞ্চলের কৃষি বিপর্যয়ের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, বাজার স্থিতিশীলতা এবং নীতিনির্ধারণের সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রশ্নচিহ্ন।

বাংলাদেশে বোরো ধান কেবল একটি ফসল নয়, এটি খাদ্য অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশের মোট চাল উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি আসে এই মৌসুমে। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চল; যেখানে এক ফসলি জমি, সেখানে বোরোই কৃষকের জীবন-জীবিকার একমাত্র ভরসা। ফলে এই অঞ্চলে উৎপাদনের সামান্য ব্যাঘাতও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, আর স্থানীয় পর্যায়ে তা রীতিমতো বিপর্যয়ে রূপ নেয়। এবারের পরিস্থিতি কিছতা জটিল।

একদিকে মৌসুমের শুরুতে ভালো ফলনের সম্ভাবনা ছিল, অন্যদিকে শেষ সময়ে এসে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা সেই সম্ভাবনাকে ক্ষয়ে দিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি প্লাবনের ঝুঁকিতে পড়েছে, আর বাস্তবে ইতোমধ্যে অনেক জমি তলিয়ে গেছে। উৎপাদনের মোট পরিমাণের তুলনায় ক্ষতির শতাংশ হয়তো খুব বড় নয়- ১ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে; কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতায় সংখ্যার বাইরেও প্রভাবের গভীরতা থাকে।

বাজারে চালের দামের ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। স্বাভাবিক অর্থনীতির নিয়মে উৎপাদন কমলে দাম বাড়ে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের চালের বাজার পুরোপুরি একক উৎসনির্ভর নয়। উত্তরাঞ্চলের জেলা যেমন নওগাঁ, রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট এই এলাকাগুলোতে বোরো কাটার মৌসুম কিছতা পরে শুরু হয় এবং সেখানে ফলন ভালো হলে হাওরের ক্ষতি আংশিকভাবে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। এই বাস্তবতায় আগামী ১০ থেকে ১৫ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরো ফসল ঘরে ওঠার আগে বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। তবে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বা ‘এক্সপেক্টেশন শক’ অনেক সময় বাস্তব ঘাটতির আগেই বাজারে দামের চাপ তৈরি করে। ব্যবসায়ীরা যদি মনে করেন সামনে সরবরাহ কমবে, তাহলে তারা মজুত বাড়াতে পারেন, যা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। আর সরকারের মজুত পরিস্থিতি এখানে একটি বড় নিয়ামক।

বর্তমানে সরকারি গুদামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল মজুত আছে প্রায় ১৩ লাখ টন। এই মজুত যদি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়, তাহলে বাজারে সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব হবে এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনেকটাই কমানো যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায় মজুত থাকলেও তা বাজারে সময়মতো পৌঁছায় না বা বিতরণ প্রক্রিয়ায় অদক্ষতা ও দুর্নীতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

বৈশ্বিক চালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও জ্বালানি সংকট, সার সরবরাহে বিঘ্ন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে দেশীয় উৎপাদনে চাপ পড়লে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে পারে, যা আবার বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার কী করবে যাতে বাজারে দামের অস্থিরতা না তৈরি হয়। প্রথমত, দ্রুত ও কার্যকরভাবে ধান সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত দামে ধান কিনতে দেরি করে বা জটিল প্রক্রিয়ার কারণে কৃষকরা সরাসরি সেই সুবিধা পান না। এতে তারা কম দামে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। এবার সেই চিত্র যেন না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ করতে হবে এবং সেটি যেন স্বচ্ছ ও সহজ প্রক্রিয়ায় হয়। দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনা প্রয়োজন। হাওরাঞ্চলের কৃষকরা এক ফসলের ওপর নির্ভরশীল। তাদের ফসল নষ্ট মানে পুরো বছরের আয় হারানো। যদি তারা পুনরায় চাষের জন্য পুঁজি না পান, তাহলে আগামী মৌসুমেও উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে নগদ সহায়তা, স্বল্পসুদে ঋণ এবং বীজ-সার সহায়তা জরুরি। এর পাশাপাশি বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে।

চালের বাজারে কারসাজি নতুন কিছু নয়। মজুতদাররা সুযোগ পেলেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। সরকারকে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে- যাতে কেউ অযৌক্তিকভাবে মজুত বাড়াতে না পারে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত, জরিমানা এবং লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্রুত শুকানোর ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়ানো জরুরি। এবারের বৃষ্টিতে অনেক ধান কাটা হলেও শুকাতে না পারার কারণে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারি গুদাম, চালকল এবং অস্থায়ী ড্রায়ার ব্যবহার করে দ্রুত ধান শুকানোর ব্যবস্থা করা গেলে অনেক ক্ষতি রোধ করা সম্ভব।

আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে নজর দিতে হবে। হাওরাঞ্চলে প্রায় প্রতি বছরই একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়; আগাম বন্যা বা আকস্মিক ঢলে ফসল নষ্ট হয়। অথচ টেকসই বাঁধ নির্মাণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এই ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সময়ক্ষেপণের কারণে সমস্যাটি থেকে যাচ্ছে। এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর ক্ষতি হওয়ার পর ত্রাণ ও সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়, কিন্তু সমস্যার মূল কারণ রয়ে যায় অমীমাংসিত। এটি কেবল অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, নীতিনির্ধারণের দুর্বলতার প্রতিফলন।

আরেকটা বিষয় হলো, কৃষি বিমা চালু করা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিমা থাকলে তাদের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে বাংলাদেশে কৃষি বিমা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলছে, বাস্তবায়ন এখনো সীমিত। কিন্তু বাজারে দামের ওপর প্রভাব কতা পড়বে- এর উত্তর এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে এটুকু বলা যায়, যদি উত্তরাঞ্চলে ভালো ফলন হয় এবং সরকার সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব।

যদি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকে, তাহলে সামান্য উৎপাদন ঘাটতিও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। হাওরের কৃষক আজ শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়ছেন না; তারা লড়ছেন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে, যেখানে প্রতিবারই তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, অথচ সবচেয়ে কম সুরক্ষা পান। এই বাস্তবতা বদলানো না গেলে, প্রতি বছরই ধান তলাবে, কৃষক কাঁদবে আর বাজারে অনিশ্চয়তার ছায়া ঘনাবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও গবেষক 
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আপ্র/কেএমএএ/০৬.০৫.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

তেলের পরে গ্যাসের লাইন: জ্বালানি সংকটের ভবিষ্যৎ কী
২৭ জুলাই ২০২৬

তেলের পরে গ্যাসের লাইন: জ্বালানি সংকটের ভবিষ্যৎ কী

আমীন আল রশীদ    জ্বালানি তেলের পরে এবার সিএনজি স্টেশনেও যানবাহনের দীর্ঘ সারি। জ্...

চুলার আগুন থেকে শিল্পের চাকা- গ্যাস সংকটে বিপন্ন বাংলাদেশ
২৭ জুলাই ২০২৬

চুলার আগুন থেকে শিল্পের চাকা- গ্যাস সংকটে বিপন্ন বাংলাদেশ

ড. হারুন রশীদ    সকালে রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না। দুপুরে পরিবারের খাবার তৈরি হয়নি...

দাম্পত্য সম্পর্কে মাদকের প্রভাব
২৭ জুলাই ২০২৬

দাম্পত্য সম্পর্কে মাদকের প্রভাব

বিবাহ একটি শরীর বৃত্তিয়-মনো- সামাজিক বন্ধন যা পারস্পরিক বিশ্বাস,  সম্মান, স্বীকৃতি,  সহভাগ...

ঘড়ির কাঁটায় বন্দি জীবন: আমাদের অদৃশ্য সামাজিক সংকট
২৬ জুলাই ২০২৬

ঘড়ির কাঁটায় বন্দি জীবন: আমাদের অদৃশ্য সামাজিক সংকট

ড. মতিউর রহমান    আজকের ব্যস্ত ঢাকায় পরিচিত কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘কেমন আছেন’;...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

শিল্পী বললেন ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ এখন প্রতিবাদের ভাষা

‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে গানটি সিলেটের এক শিক্ষিকাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া সমালোচনার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শিক্ষকদের সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। গানটির গায়ক মেজবাহ রহমান বলেন, “আমাদের এই গানটি যে অন্যায্য সমালোচনার বিরুদ্ধে একটি বড় সামাজিক আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠবে, তা কখনো ভাবিনি। গানটি মূলত প্রকৃতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যেভাবে এটি ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এখন এটি অনেকের কাছে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।” প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন গানটি সত্যিই প্রতিবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 14 ঘন্টা আগে