গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

মেনু

বৃষ্টি হলেই চট্টগ্রাম ডোবে কেন?

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:২৮ পিএম, ০৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৪:২৯ এএম ২০২৬
বৃষ্টি হলেই চট্টগ্রাম ডোবে কেন?
ছবি

ছবি: সংগৃহীত

সমীরণ বিশ্বাস

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর চট্টগ্রাম। পাহাড়, নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলিত ভূপ্রকৃতির কারণে এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্প-কারখানা, আমদানি-রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রবেশদ্বার এই নগরী। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ভারী বর্ষণ হলেই নগরীর বহু এলাকা কোমর কিংবা বুক সমান পানিতে তলিয়ে যায়।

কোথাও ফ্ল্যাশ ফ্লাড, কোথাও জলাবদ্ধতা, আবার কোথাও জোয়ারের পানিতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। বৃষ্টি হলেই কেন ডুবে যায় চট্টগ্রাম? পাহাড়, নদী, সাগর ও নগর ব্যবস্থাপনার জটিল বাস্তবতা।

একইভাবে টানা বর্ষণে কক্সবাজারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু সমান পানি জমে যায়, পাহাড়ি ঢলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সমুদ্রের এত কাছে থাকা চট্টগ্রাম কেন পানিতে ডুবে?

বৃষ্টির পানি সাগরে যেতে বাধা কোথায়? আর এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের প্রকৃতি, ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু এবং নগর ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে কর্ণফুলী নদী এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। স্বাভাবিকভাবে পাহাড়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচের সমতলে নেমে আসে। একই সময়ে নগরীর নিজস্ব বৃষ্টির পানি, পাহাড়ি ঢল এবং জোয়ারের প্রভাব একত্রে কাজ করলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পানি জমে যায়।

অনেকে মনে করেন, সমুদ্রের পাশে শহর হওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত সাগরে চলে যাওয়ার কথা। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। বৃষ্টির পানি সাগরে যেতে হলে খাল, নালা, ড্রেন ও নদীপথের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত থাকতে হয়। কিন্তু নগরীর বহু প্রাকৃতিক খাল দখল, ভরাট এবং সংকুচিত হয়ে গেছে। কোথাও অপরিকল্পিত সড়ক, কোথাও আবাসন, কোথাও বাজার কিংবা শিল্প স্থাপনা পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত করেছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জোয়ার। যখন বঙ্গোপসাগরে উচ্চ জোয়ার থাকে, তখন কর্ণফুলী নদীর পানির স্তর বেড়ে যায়। ফলে শহরের ড্রেন ও খাল দিয়ে বৃষ্টির পানি নদীতে নামতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে নদীর পানি উল্টো শহরের দিকে চাপ সৃষ্টি করে।

অর্থাৎ বৃষ্টির পানি বের হতে না পেরে শহরের ভেতরেই আটকে যায়। এ অবস্থাকে প্রকৌশল ভাষায় ‘ব্যাকওয়াটার ইফেক্ট’ বলা হয়। অর্থাৎ নদী বা সাগরের পানির উচ্চতা এত বেশি থাকে যে শহরের পানি বের হওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বর্তমানে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি আগের তুলনায় অনেক বেশি হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কয়েকশ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে শতবর্ষ আগের নকশায় নির্মিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা সেই পানি বহন করতে পারে না।

চট্টগ্রামে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তা হলো, ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা এই মৌসুমে সর্বোচ্চ রেকর্ড (ঢাকা পোস্ট, ৭ জুলাই ২০২৬)। এর ফলে পানির নিচে রেললাইন চলে গিয়েছে আটকা পড়েছে কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ (ঢাকা পোস্ট, ৭ জুলাই ২০২৬)। ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের আউটার রিং রোডের একাংশ ধসে পড়েছে (ঢাকা পোস্ট, ৭ জুলাই ২০২৬)।

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের প্রবেশপথে ও পার্কি জোনে পানি জমে গেছে (ঢাকা পোস্ট, ৬ জুলাই ২০২৬)।

অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে জোয়ারের উচ্চতাও বাড়ছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রামের আরেকটি বড় সমস্যা হলো পাহাড় কাটা। প্রাকৃতিক পাহাড় বৃষ্টির পানি কিছুটা ধরে রাখে এবং ধীরে ধীরে নিচে নামতে দেয়। কিন্তু পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণের ফলে পানি দ্রুত নিচে নেমে আসে। একই সঙ্গে ভূমিধসের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। নগরায়ণের ফলে মাটির প্রাকৃতিক পানি শোষণ ক্ষমতাও কমে গেছে। আগে খোলা মাঠ, জলাভূমি ও কৃষিজমি বৃষ্টির পানি শোষণ করত। এখন সেগুলোর জায়গায় কংক্রিটের ভবন, রাস্তা ও পার্কিং এলাকা তৈরি হয়েছে। ফলে অধিকাংশ পানি সরাসরি ড্রেনে চলে আসে এবং অল্প সময়েই ড্রেনের ধারণক্ষমতা অতিক্রম করে।

খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির সমস্যার প্রকৃতি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে পাহাড়ি ঢল খুব দ্রুত নিচু এলাকায় নেমে আসে। ছোট নদী ও ছড়াগুলো অল্প সময়ে পূর্ণ হয়ে যায়। কোথাও সেতু, কালভার্ট বা ড্রেন সংকীর্ণ হওয়ায় পানি আটকে গিয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে পাহাড় ধসের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

কক্সবাজারেও একই ধরনের বহুমাত্রিক সমস্যা কাজ করে। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, নিম্নভূমি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট এবং জোয়ারের সম্মিলিত প্রভাবে নিম্নাঞ্চল দ্রুত প্লাবিত হয়। পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় দ্রুত নগর সম্প্রসারণ অনেক প্রাকৃতিক পানি ধারণ এলাকা নষ্ট করেছে।

তাহলে মুক্তির পথ কী?
প্রথমত, প্রাকৃতিক খাল, জলাধার ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার করতে হবে। এগুলো শহরের কিডনির মতো কাজ করে। পানি জমা রাখে এবং ধীরে ধীরে নদীতে পাঠায়।

দ্বিতীয়ত, পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিক হাইড্রোলজিক্যাল মডেলের ভিত্তিতে পুনঃনকশা করতে হবে। আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বিবেচনায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করা জরুরি।

তৃতীয়ত, কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত সব খালকে কার্যকর রাখতে হবে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে জোয়ার নিয়ন্ত্রণকারী স্বয়ংক্রিয় স্লুইসগেট ও শক্তিশালী পাম্পিং স্টেশন স্থাপন করতে হবে, যাতে উচ্চ জোয়ারের সময়ও শহরের পানি বাইরে পাঠানো যায়।

চতুর্থত, খাল, নালা ও ড্রেনে বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য ড্রেনের ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।

পঞ্চমত, নগর পরিকল্পনায় ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা গ্রহণ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে পার্ক, উন্মুক্ত সবুজ এলাকা, রেইন গার্ডেন, পারমিয়েবল পেভমেন্ট এবং কৃত্রিম জলাধারের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে ধরে রাখা হয়, যাতে তা একসঙ্গে ড্রেনে চাপ সৃষ্টি না করে।

ষষ্ঠত, পাহাড় কাটা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ে দ্রুত বনায়ন করতে হবে। এতে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হবে এবং ভূমিধসের ঝুঁকিও কমবে।

সপ্তমত, আবহাওয়া পূর্বাভাস, ডপলার রাডার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিয়েল-টাইম বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ এবং স্বয়ংক্রিয় বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। আগাম সতর্কতা মানুষের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

অষ্টমত, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিকে পৃথক জলাধারা বা ক্যাচমেন্টভিত্তিক সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। কারণ প্রতিটি এলাকার ভূপ্রকৃতি ভিন্ন; তাই এক এলাকার সমাধান অন্য এলাকায় কার্যকর নাও হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি শুধু প্রকৃতির সমস্যা নয়; পরিকল্পনারও সমস্যা। অতিবৃষ্টি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই বৃষ্টির পানি কীভাবে নিরাপদে নদী ও সাগরে পৌঁছাবে, ওই ব্যবস্থা আমরা অবশ্যই করতে পারি। চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে হলে খণ্ডিত নয়, সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, জলবিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, স্থানীয় সরকার, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ নাগরিক, সবাইকে একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে নগর ব্যবস্থাপনার পুরোনো ধারণা আর কার্যকর নয়। ভবিষ্যতের চট্টগ্রামকে নিরাপদ রাখতে হলে আজই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রাকৃতিক জলপথ সংরক্ষণ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের পথে এগোতে হবে। অন্যথায় প্রতিটি বর্ষাই আমাদের মনে করিয়ে দেবে, প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে কোনো নগরকে টেকসই রাখা যায় না।

লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/০৮.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

তেলের পরে গ্যাসের লাইন: জ্বালানি সংকটের ভবিষ্যৎ কী
২৭ জুলাই ২০২৬

তেলের পরে গ্যাসের লাইন: জ্বালানি সংকটের ভবিষ্যৎ কী

আমীন আল রশীদ    জ্বালানি তেলের পরে এবার সিএনজি স্টেশনেও যানবাহনের দীর্ঘ সারি। জ্...

চুলার আগুন থেকে শিল্পের চাকা- গ্যাস সংকটে বিপন্ন বাংলাদেশ
২৭ জুলাই ২০২৬

চুলার আগুন থেকে শিল্পের চাকা- গ্যাস সংকটে বিপন্ন বাংলাদেশ

ড. হারুন রশীদ    সকালে রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না। দুপুরে পরিবারের খাবার তৈরি হয়নি...

দাম্পত্য সম্পর্কে মাদকের প্রভাব
২৭ জুলাই ২০২৬

দাম্পত্য সম্পর্কে মাদকের প্রভাব

বিবাহ একটি শরীর বৃত্তিয়-মনো- সামাজিক বন্ধন যা পারস্পরিক বিশ্বাস,  সম্মান, স্বীকৃতি,  সহভাগ...

ঘড়ির কাঁটায় বন্দি জীবন: আমাদের অদৃশ্য সামাজিক সংকট
২৬ জুলাই ২০২৬

ঘড়ির কাঁটায় বন্দি জীবন: আমাদের অদৃশ্য সামাজিক সংকট

ড. মতিউর রহমান    আজকের ব্যস্ত ঢাকায় পরিচিত কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘কেমন আছেন’;...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই