গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

পল্লী বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল বন্ধ হোক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮:৫৮ পিএম, ০৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৪:৪৪ এএম ২০২৬
পল্লী বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল বন্ধ হোক
ছবি

ছবি: সংগৃহীত

ওসমান গনি

একটি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা পরিমাপের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো তাদের নিত্যদিনের জীবনযাপনে স্বস্তি। দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের সেই যাপিত জীবনের স্বস্তির জায়গাটি চরমভাবে বিঘ্নিত ও বিপর্যস্ত হচ্ছে। গত মাস থেকে হঠাৎ করেই পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক পর্যায়ে অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের যে অনাকাক্সিক্ষত প্রবণতা দেখা দিয়েছে, তা দেশের প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত মানুষের মনে তীব্র অসন্তোষ, হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

দেশের যে বিশাল জনগোষ্ঠীর নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা, যাদের নুন-ভাতের সংস্থান করতেই প্রতিদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়, তাদের ঘাড়ে কিছুদিন পরপর এভাবে বিদ্যুৎ বিলের বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে অনুরণিত হচ্ছে। চায়ের দোকান, গণপরিবহন, হাটবাজার থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবখানেই এখন সাধারণ মানুষের একটাই আকুতি, একটাই হাহাকার; এই অস্বাভাবিক বিলের চাদর থেকে মুক্তি কোথায়? মানুষের জীবনের এই নাভিশ্বাস ওঠার মতো পরিস্থিতি কোনো সুশাসিত সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

রাজনীতি ও ক্ষমতার পালাবদল সাধারণ মানুষের জীবনে তখনই অর্থবহ এবং কল্যাণকর হয়ে ওঠে, যখন তা তাদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, বেঁচে থাকার লড়াইটাকে কিছুটা সহজ করে দেয়। ২০২৪ সালে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আপামর সাধারণ মানুষ এক বুক আশা নিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল। একটা বড় অংশের অবদমিত ভাবনায় ছিল, হয়তো নতুন জমানায় এসে তারা পূর্বের চেয়ে কিছুটা স্বস্তিতে, কিছুটা শান্তিতে এবং মুক্ত বাতাসে জীবনধারণ করতে পারবে। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের পর দেশের প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ বাস্তবে যা দেখছে, তা তাদের আশার গুড়ে বালি ঢেলে দেওয়ার শামিল।

বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বগতি এমনিতেই সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে প্রতিটি কাঁচাবাজারের আগুন দামে যখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সংসার চালানো এক প্রকার দুঃসাধ্য এবং অলীক কল্পনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ বিলের এই অনাকাক্সিক্ষত ও অযৌক্তিক বৃদ্ধি মানুষের ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই আর্থিক কষাঘাত সাধারণ মানুষের সহনশীলতার চরম পরীক্ষা নিচ্ছে।

বিদ্যুৎ এখন আর কোনো বিলাসিতা কিংবা অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা নয়, মানুষের মৌলিক ও অপরিহার্য চাহিদার অংশ; বিশেষ করে গ্রামীণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী- যারা পল্লী বিদ্যুতের মূল চালিকাশক্তি ও গ্রাহক। তাদের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি ও ক্ষুদ্র জীবিকা এই বিদ্যুতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, একজন সেচ পাম্পের মালিক কৃষক কিংবা একজন সাধারণ চাকরিজীবীর আয়ের নির্দিষ্ট সীমা থাকে। মাস শেষে তাদের আয় এক টাকাও বাড়ে না। কিন্তু বিদ্যুৎ বিলের এই ভুতুড়ে এবং হঠাৎ উল্লম্ফন তাদের আয়ের সব হিসাব-নিকাশ, বাজেট ও জীবনযাত্রার পরিকল্পনা ওলটপালট করে দিচ্ছে।

যখন একটি পরিবারকে তাদের সীমিত আয়ের বড় একটা অংশ কেবল বিদ্যুৎ বিল মেটাতেই ব্যয় করে ফেলতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের খাদ্য তালিকা থেকে প্রোটিন বাদ দিতে হয়, সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের চিকিৎসার মতো অতি জরুরি ও মৌলিক খাতগুলোতে আপস করতে হয়। ফলে মানুষের পুষ্টিহীনতা বাড়ে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক জনজীবন এক চরম অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারের মুখে পতিত হয়। নতুন সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী, কিন্তু এক এক করে করের বোঝা বৃদ্ধি, পরোক্ষ ট্যাক্স আরোপ এবং বিভিন্ন সেবার মূল্যবৃদ্ধি মানুষের সেই প্রত্যাশাকে ক্রমাগত আশাহত করছে।
আরও দেখুন

এ দেশের মানুষ যুগে যুগে আন্দোলনে-সংগ্রামে প্রমাণ করেছে যে, তারা আর আগের মতো অসচেতন, অনুগত কিংবা বোকা নেই। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ, সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তৃতি এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার কারণে দেশের মানুষ এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি চালাক, দূরদর্শী ও অধিকারসচেতন। তারা খুব ভালো করেই বোঝে কখন কোন নীতি তাদের স্বার্থের অনুকূলে যাচ্ছে আর কখন সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে। জোর-জবরদস্তি, ভীতি প্রদর্শন কিংবা কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে বেশিদিন সাধারণ মানুষকে শান্ত ও নিশ্চুপ রাখা যায় না, যদি না তাদের মৌলিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

ইতিহাস সবসময় এই নির্মম সত্যের সাক্ষ্য দেয় যে, যখনই সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকছে, যখনই তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং যখনই ক্ষোভের পারদ সীমা লঙ্ঘন করেছে, তখনই তারা আর ঘরে বসে থাকেনি। জনবিস্ফোরণ কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি হলো বছরের পর বছর কিংবা মাসের পর মাস ধরে জমে থাকা মানুষের নীরব ক্ষোভ, অবহেলা, নীতিনির্ধারকদের ঔদ্ধত্ত্য আর বঞ্চনার এক চূড়ান্ত ও প্রলয়ঙ্কারী বহিঃপ্রকাশ।

পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ঘণ্টা যেভাবে আকস্মিকভাবে বেজেছিল, তা থেকেও এই ঐতিহাসিক সত্য স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কোনো সরকারই চিরস্থায়ী বা অপরাজিত নয়, যদি তারা জনগণের চোখের ভাষা, মনের ভাষা আর পেটের ক্ষুধা বুঝতে না পারে। তাই বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্য এখনই সময় আত্মোপলব্ধির, আত্মসমালোচনার এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের।

ক্ষমতার চেয়ারে বসে জনবিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিন ফুরিয়ে এসেছে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, মেহনতি মানুষ এবং ব্যবসায়ী, সবার একটাই জোর দাবি ও আকুল আবেদন, অবিলম্বে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করা হোক, সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হোক এবং পল্লী বিদ্যুতের এই ভুতুড়ে, অস্বাভাবিক ও বাড়তি বিলের বোঝা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক।

বিদ্যুতের বিল যেন সাধারণ মানুষের জন্য সহনীয়, যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়, তা নিশ্চিত করা এই মুহূর্তের সরকারের অন্যতম প্রধান ও জরুরি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সাধারণ মানুষের পকেট কেটে, তাদের পেটে লাথি মেরে রাষ্ট্র পরিচালনার বা রাজস্ব বাড়ানোর নীতি কখনো দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনে না, বরং তা সরকারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয় এবং জনবিস্ফোরণকে ত্বরান্বিত করে।

মানুষের ক্ষোভের দেয়াল যেন আর দীর্ঘ না হয়, দেশের মানুষ যেন ঘরের আলো জ্বালাতে গিয়ে নিজেদের জীবনের সব আলো নিভিয়ে না ফেলে, সেদিকে পরম যত্নশীল হওয়া এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে বর্তমান নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার পরিচয়। জনগণ কোনো রাজনৈতিক জটিলতা বোঝে না, তারা শান্তি চায়, দুবেলা দুমুঠো খেয়ে স্বস্তিতে বাঁচতে চায় এবং এর অন্যথা হলে ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি ও গণ-অসন্তোষ এড়ানো কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হয়ে উঠবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/০৯.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

বিচারপ্রবণ বা দোষ সন্ধানী মানসিকতা, ন্যায় বিচারের পথে অন্তরায়
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিচারপ্রবণ বা দোষ সন্ধানী মানসিকতা, ন্যায় বিচারের পথে অন্তরায়

ব্যারিস্টার পল্লব আচার্যপেশাগত, সামাজিক, পারিবারিক, বংশগত বা ব্যক্তিগত অবস্থানের ভিত্তিতে প্রত্যেক ম...

এশিয়ান গেমসে প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এশিয়ান গেমসে প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

জাহিদ রহমানপ্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঝটপট কিছু করার চেয়ে যে কোনো কিছু সঠিক পরিকল্পনায় করতে বেশি উৎসা...

আরও বিশ্ববিদ্যালয় কেন, কার স্বার্থে?
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আরও বিশ্ববিদ্যালয় কেন, কার স্বার্থে?

খায়ের মাহমুদবাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনার চেয়ে যেন রাজনৈতিক মর্যাদা, আ...

সম্পত্তি হস্তান্তরের আইন: কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সম্পত্তি হস্তান্তরের আইন: কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরসম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইনের গেজেটেও প্রকাশি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই