মোঃ সেলিমুজ্জামান
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু উঁচু দালান, প্রশস্ত সড়ক, উচ্চতর ডিগ্রি, ভালো ফলাফল কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। একটি জাতির আসল শক্তি তার শিক্ষিত, দক্ষ, সৎ ও মানবিক নাগরিক। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান, দক্ষতা, মনোভাব ও যোগাযোগ সক্ষমতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষা এমন এক শক্তি, যা মানুষকে শুধু জ্ঞানী করে না; তাকে সচেতন, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
তাই যদি আমরা সত্যিই একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে চাই, তবে সর্বপ্রথম পরিবর্তন আনতে হবে শিক্ষাব্যবস্থায়; পাশাপাশি পরিবর্তন করতে হবে এই ব্যবস্থার মূল কারিগর-শিক্ষকদের জীবনমানে। কারণ শিক্ষা বদলালে মানুষ বদলাবে, মানুষ বদলালে সমাজ বদলাবে, আর সমাজ বদলালে বদলে যাবে দেশ।
বর্তমান বিশ্বের যেসব দেশ উন্নয়নের শিখরে পৌঁছেছে, তাদের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা। তারা উপলব্ধি করেছে, শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা বা চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়; এটি জীবন গঠনের ভিত্তি। আমাদের দেশেও যদি সেই উপলব্ধি বাস্তবায়িত হয়, তবে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা: আমাদের দেশে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, সার্টিফিকেট অর্জনের আগ্রহ বেড়েছে, বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সংখ্যাগত এই অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। আজও বহু ক্ষেত্রে শিক্ষা মুখস্থবিদ্যার গণ্ডিতে আবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য পড়াশোনা করে, কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করার দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।
অনেক সময় দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল করলেও কর্মজীবনে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারে না। কারণ তার মধ্যে নেতৃত্বগুণ, যোগাযোগ দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ যথাযথভাবে বিকশিত হয়নি। বিশেষ করে বর্তমান যুগে যোগাযোগ দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। ফলে শিক্ষা ও বাস্তব জীবনের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য: শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে সত্যবাদী, সৎ, ন্যায়পরায়ণ, মানবিক ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলে। শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা একজন শিক্ষার্থীকে শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী, উদ্ভাবক এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে তৈরি করবে।
শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। সে আইন মেনে চলতে শেখে, অন্যের মতামতকে সম্মান করতে শেখে এবং সমাজের প্রতি নিজের কর্তব্য উপলব্ধি করে। এ ধরনের শিক্ষা একটি সভ্য ও উন্নত জাতি গঠনের ভিত্তি।
নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের গুরুত্ব: আজকের সমাজে দুর্নীতি, মাদকাসক্তি, সহিংসতা, প্রতারণা ও অসহিষ্ণুতার মতো সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এসব সমস্যার অন্যতম কারণ নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি। একজন শিক্ষার্থী যদি ছোটবেলা থেকেই সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সহানুভূতি ও মানবিকতার শিক্ষা লাভ করে, তবে ভবিষ্যতে সে একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ-এই তিন ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধু জ্ঞান বা সার্টিফিকেট নয়, চরিত্র ও মানবিকতাও বিকশিত হয়। কারণ মানবতাবিহীন মেধা কখনোই কোনো দেশের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না।
প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা: বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, প্রোগ্রামিং, ডেটা বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তি বিশ্বকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হতে হবে।
শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, গবেষণার মানসিকতা, সৃজনশীলতা এবং দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে তারা আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। শিক্ষার্থীর আত্মনির্ভরশীলতা মানে সমাজের উন্নয়ন, আর সমাজের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন।
শিক্ষকের ভূমিকা: একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ হলো আদর্শবান ও দক্ষ শিক্ষক। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি শিক্ষার্থীর চরিত্র, চিন্তাভাবনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর।
তাই শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে পরিচয়, গবেষণার সুযোগ এবং পেশাগত উন্নয়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের সামাজিক মর্যাদা, কর্মপরিবেশ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কাগজে-কলমে শিক্ষকতাকে সম্মানজনক বা সেবামূলক পেশা হিসেবে ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেই সম্মান বাস্তব জীবনেও প্রতিফলিত হতে হবে। কারণ একজন অনুপ্রাণিত শিক্ষক শত শত শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারেন।
অভিভাবক ও সমাজের দায়িত্ব: শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়; পরিবারই একজন শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখান থেকেই সে ভাষা, আচরণ, মূল্যবোধ ও মানবিকতার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা উচ্চশিক্ষার দিকে নয়, তাদের নৈতিকতা, আচরণ, মানবিকতা ও সৃজনশীলতার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া।
সমাজের প্রতিটি মানুষকে শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা যেন ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত না হয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
দেশ গঠনে শিক্ষার ভূমিকা: যে দেশে শিক্ষার মান উন্নত এবং কারিগরি শিক্ষার সুব্যবস্থা রয়েছে, সেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়; সেখানে দুর্নীতি কমে, আইনের শাসন সুদৃঢ় হয়। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী নতুন উদ্ভাবন সৃষ্টি করে, শিল্প-কারখানা গড়ে তোলে, গবেষণায় যুক্ত হয়ে জ্ঞানকে কাজে লাগায় এবং বিশ্বে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
অন্যদিকে নিম্নমানের বা প্রযুক্তিগত জ্ঞানবিহীন শিক্ষাব্যবস্থা একটি দেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই শিক্ষাখাতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, ভবিষ্যতের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের যদি মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সঠিক দিকনির্দেশনা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া যায়, তবে তারাই ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশের নির্মাতা হবে।
‘দেশ বদলাতে চাইলে, শিক্ষা বদলাতে হবে’-এটি শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি একটি বাস্তব সত্য। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্ষা যদি যুগোপযোগী, মানবিক, নৈতিক ও দক্ষতাভিত্তিক হয়, তবে সেই দেশের মানুষও হবে সৎ, সচেতন ও উদ্ভাবনী।
অতএব: আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে থাকবে সৃজনশীলতা, প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা, আর শুধু পরীক্ষার ফলাফলের পরিবর্তে গুরুত্ব পাবে চরিত্র, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ। কারণ শিক্ষা বদলালেই বদলাবে মানুষ, মানুষ বদলালেই বদলাবে সমাজ, আর সমাজ বদলালেই বদলে যাবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, জামিলা খাতুন লালবাগ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কেএমএএ/আপ্র/২৯.০৭.২০২৬