গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

মেনু

বিশ্ব বাঘ দিবস

সুন্দরবনের বাঘ টিকিয়ে রাখার লড়াই কঠিন হচ্ছে

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০১:৪৮ পিএম, ২৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০২:৪৯ এএম ২০২৬
সুন্দরবনের বাঘ টিকিয়ে রাখার লড়াই কঠিন হচ্ছে
ছবি

সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। চোরাশিকার, খাদ্যসংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে বাঘের আবাস ও স্বাভাবিক বিচরণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে -ছবি সংগৃহীত

সুন্দরবনের বাঘের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু চোরাশিকার বা খাদ্যসংকট নয়; ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত চাপ ও জিনগত অভিযোজনের সংকটও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশাল নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলে বাঘের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় তাদের জিনগত বৈচিত্র্য কমছে এবং দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ও অভিযোজন ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আজ ২৯ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা ও সংরক্ষণে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশেও কেন্দ্রীয়ভাবে এবং সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জে আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় নতুন উদ্বেগ
সুন্দরবনের বাঘের জিনগত গঠন নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বনটির অভ্যন্তরে পাঁচটি বড় নদী পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে কার্যত আলাদা করে রেখেছে। ফলে সাতক্ষীরা, খুলনা ও চাঁদপাই অঞ্চলের বাঘের মধ্যে স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন সীমিত হচ্ছে।

সুন্দরবনের খালের ধারে হাঁটছে বাঘ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, দীর্ঘদিন একই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে বাঘের জিনগত কাঠামোয় সূক্ষ্ম পরিবর্তন তৈরি হয়েছে। এই বিচ্ছিন্নতা ভবিষ্যতে আন্তঃপ্রজননের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সুন্দরবন একাডেমি ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, চোরাশিকার, খাদ্যসংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এতে বাঘের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে এবং তাদের টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

বাঘের সংখ্যা বেড়েছে, মিলেছে ২১ শাবকের ছবি
বন বিভাগের ২০২৪ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি। এর আগে ২০১৫ সালে ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালে ১১৪টি। সর্বশেষ জরিপে ২১টি বাঘশাবকের ছবি পাওয়া গেছে, যা প্রজননের ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সংখ্যাবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খল নিরাপদ না হলে এই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে।

ছয় মাস চিকিৎসার পর বনে ফিরল আহত বাঘিনী
বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রাক্কালে সুন্দরবনে ফিরে এসেছে একটি আহত বাঘিনী। গত ৩ জানুয়ারি হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘিনীটি গুরুতর আহত হয়। পরদিন ট্রাঙ্কুইলাইজার ব্যবহার করে তাকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী পুনর্বাসনকেন্দ্রে নেওয়া হয়।

বাঘিনী ও শাবকের দূর থেকে তোলা প্রাকৃতিক ছবি

প্রায় ছয় মাস সাত দিন চিকিৎসা ও আচরণগত পর্যবেক্ষণের পর গত ১২ জুলাই তাকে সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে আহত বাঘকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রথম ঘটনা।

ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, এই ঘটনা দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সক্ষমতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “একটি বাঘিনীকে সুস্থ করে ফিরিয়ে দিলেই সুন্দরবনের বাঘ নিরাপদ হয়ে যায় না; খাদ্যচক্র ও আবাসস্থল সুরক্ষিত রাখতে হবে।”

অবমুক্তির পর নজরদারিতে বাঘিনী
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বাঘিনীটিকে উদ্ধারস্থল থেকে প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার দূরের একটি নিরাপদ বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।

তার চলাফেরা পর্যবেক্ষণে ১৯টি ইনফ্রারেড ক্যামেরা বসানো হয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাঘিনীটি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে এবং ওই এলাকায় খাদ্যের সংকট নেই।

বন বিভাগের টহল বা ক্যামেরা ট্র্যাপ স্থাপনের দৃশ্য

অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, অবমুক্তির আগে বাঘিনীর শিকারের দক্ষতা, আচরণ ও শারীরিক সক্ষমতা একাধিক ধাপে পরীক্ষা করা হয়েছিল। শেষ দেড় মাস তাকে জীবন্ত ছাগল ও বুনো শূকর দিয়ে স্বাভাবিক শিকারি প্রবৃত্তি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়।

চোরাশিকার এখনো বড় হুমকি
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় দেড় হাজার কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে ৯৬টি মামলায় ২০৪ জনকে আসামি করা হয় এবং ১৪৯ জন গ্রেপ্তার হন।

শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৮০০ কেজি হরিণের মাংস, এক লাখ ১৪ হাজার ফুটের বেশি মালা ফাঁদ এবং শত শত ছিটকা ও হাঁটা ফাঁদ।

ড. এম এ আজিজ বলেন, “বাঘ রক্ষা করতে হলে আগে হরিণ রক্ষা করতে হবে। হরিণ কমে গেলে সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়বে।”

মানুষ-বাঘ দ্বন্দ্বের দীর্ঘ ইতিহাস
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ বছরে অন্তত ৯১টি বাঘ মারা গেছে। এর মধ্যে—

* ২৬টি চোরাশিকারি ও পাচারকারীদের হাতে,

* ১৪টি গ্রামবাসীর পিটুনিতে,

* ১৮টি বনদস্যুদের হাতে,

* ২১টি বার্ধক্যজনিত কারণে,

* ৩টি প্রাকৃতিক দুর্যোগে।

অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী।

তবে বন বিভাগের দাবি, ২০২৪ সালের পর সুন্দরবনে আর কোনো বাঘ হত্যার ঘটনা ঘটেনি।

সংরক্ষণে কী করছে বন বিভাগ
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আশ্রয়ের জন্য সুন্দরবনের ২০টি স্থানে উঁচু মাটির টিলা ও মিষ্টি পানির পুকুর তৈরি করা হয়েছে। ক্যামেরা ট্র্যাপে সেখানে বাঘের উপস্থিতিও ধরা পড়েছে।

এ ছাড়া ২৫টি চোরাশিকার হটস্পট চিহ্নিত করে নিয়মিত ক্যামেরা ট্র্যাপিং, স্মার্ট প্যাট্রোলিং, ড্রোন নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার কার্যক্রম চলছে।

জুলাই-আগস্ট মাসে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার ৮ হাজার ২৭১ জন জেলেকে মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বনজ সম্পদের ওপর চাপ কমে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও শিল্পায়নের চাপ
পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, সুন্দরবনের ওপর শিল্পায়ন, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত চাপ বাড়ছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ধরার সদস্যসচিব শরীফ জামিল বলেন, কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা যথাযথভাবে না হলে সুন্দরবনের প্রতিবেশ আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

ক্যামেরা ট্র্যাপে ধারণ করা সুন্দরবনের বাঘের ছবি

আইইউসিএন বাংলাদেশের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, শুধু বাঘ গণনা নয়, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সংরক্ষণ পরিকল্পনা প্রয়োজন। ভারতের মতো ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়া গেলে বাংলাদেশেও বাঘের সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব।

আইনি সুরক্ষা থাকলেও প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণে প্রথম বড় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে, যখন সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন আরও কঠোর শাস্তির বিধান করে।

তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি খাদ্যপ্রাণী সংরক্ষণ, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, চোরাশিকার দমন, বনজীবীদের বিকল্প জীবিকা এবং জলবায়ু সহনশীল ব্যবস্থাপনা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে সুন্দরবনের বাঘ দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ থাকবে না।

বিশ্ব বাঘ দিবসে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা একটাই—সুন্দরবন সুরক্ষিত থাকলে তবেই সুরক্ষিত থাকবে বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। [ছবিগুলো সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট উৎস থেকে নেওয়া]
সানা/আপ্র/২৯/৭/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন? আলোচনার শীর্ষে মির্জা ফখরুল
২৮ জুলাই ২০২৬

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন? আলোচনার শীর্ষে মির্জা ফখরুল

দৈনিক কালবেলার প্রতিবেদনে দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি

গ্যাস সংকট সহসা কাটছে না, আরো প্রায় সপ্তাহখানেক
২৬ জুলাই ২০২৬

গ্যাস সংকট সহসা কাটছে না, আরো প্রায় সপ্তাহখানেক

এলএনজি টার্মিনাল সচল হতে লাগবে চার-পাঁচ দিন; কমেছে সরবরাহ, চুলা জ্বলছে না, বিপাকে শিল্প-পরিবহন

উল্টোরথের পথে ছিল শক্তিশালী পাইপ বোমা
২৫ জুলাই ২০২৬

উল্টোরথের পথে ছিল শক্তিশালী পাইপ বোমা

রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার করা শক্তিশালী পাইপ বোমাটি (আইইডি) সনাতন ধর্মাবলম...

জয়ের আসল নাম দল, শৃঙ্খলা ও ফুটবলসভ্যতা
২১ জুলাই ২০২৬

জয়ের আসল নাম দল, শৃঙ্খলা ও ফুটবলসভ্যতা

ফিফা বিশ্বকাপ -২০২৬

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

শিল্পী বললেন ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ এখন প্রতিবাদের ভাষা

‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে গানটি সিলেটের এক শিক্ষিকাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া সমালোচনার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শিক্ষকদের সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। গানটির গায়ক মেজবাহ রহমান বলেন, “আমাদের এই গানটি যে অন্যায্য সমালোচনার বিরুদ্ধে একটি বড় সামাজিক আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠবে, তা কখনো ভাবিনি। গানটি মূলত প্রকৃতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যেভাবে এটি ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এখন এটি অনেকের কাছে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।” প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন গানটি সত্যিই প্রতিবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 ঘন্টা আগে