একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম অফিস: মধ্যপ্রাচ্যে হুতি হামলার ঝুঁকির কারণে সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) নিয়ে উল্টো পথে আফ্রিকা ঘুরে চট্টগ্রামে আসছে ‘এমটি নিনেমিয়া’। এ কারণে মূল পরিবহন ভাড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৫৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৩৩ ডলার।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টনের বেশি অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল নিয়ে যাত্রা করা জাহাজটিকে নিরাপদ পথ হিসেবে বেছে নিতে হয়েছে দীর্ঘ সমুদ্রপথ। জাহাজটি সুয়েজ খাল, জিব্রাল্টার প্রণালি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ বা উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে চট্টগ্রামে আসছে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) সূত্র জানায়, উল্টো পথে জাহাজ পরিচালনার কারণে বাড়তি ব্যয়ের হিসাব জানিয়ে গত ২৩ জুলাই বিপিসিকে চিঠি দিয়েছে বিএসসি। এর মধ্যে সুয়েজ খালের টোল বাবদ ব্যয় হবে প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। এছাড়া অতিরিক্ত জ্বালানি, বাংকারিং ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যুক্ত হয়েছে।
সূত্র জানায়, আগে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে চট্টগ্রামে আসতে সময় লাগত ১৩ থেকে ১৫ দিন। কিন্তু এবার আফ্রিকা ঘুরে আসায় সময় লাগবে প্রায় ৪৫ দিন। অতিরিক্ত প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দেওয়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়ছে সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৮ থেকে ৫০ কোটি টাকা।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, শিপিং এজেন্ট উল্টো পথে জ্বালানি পরিবহনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এ জন্য তারা বাড়তি খরচের হিসাব দিয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে দর কষাকষি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যুদ্ধকালীন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিএসসি সূত্র জানায়, গত ২৩ জুলাই ইয়ানবু বন্দর থেকে ক্রুড অয়েল নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘এমটি নিনেমিয়া’। বর্তমানে জাহাজটি সুয়েজ খাল অতিক্রম করে জিব্রাল্টার প্রণালির দিকে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে এটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে। এরপর ছোট জাহাজের মাধ্যমে বহির্নোঙর থেকে তেল খালাস করে পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নেওয়া হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, এলপিজি, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন, এমএস অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদন করা হয়।
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে, যা দেশের বার্ষিক প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। বাকি অংশ স্থানীয় উৎস ও কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পাওয়া যায়।
জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে উল্টো পথে জাহাজ আনার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. আনাম চৌধুরী।
তিনি বলেন, হুতিরা যেভাবে সৌদি আরবে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, তাতে এক লাখ টনের বেশি ক্রুড অয়েল বহনকারী জাহাজ হামলার শিকার হলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে। জাহাজ ডুবে গেলে প্রাণহানি, সাগরে তেল ছড়িয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই ইউরোপের জাহাজগুলোর মতো আফ্রিকা ঘুরে নিরাপদ পথে জ্বালানি আনা যুক্তিসংগত।
তবে তিনি বলেন, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়, সুয়েজ খালের টোল, জাহাজের জ্বালানি খরচ এবং পরিশোধিত জ্বালানির প্রতি লিটারের ব্যয়—সব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
বিএসসি সূত্র জানায়, ২৪৯ দশমিক ৯৫ মিটার দীর্ঘ ‘এমটি নিনেমিয়া’ এর আগেও দেশের জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে বিপিসির ক্রুড অয়েল পরিবহন ব্যাহত হয়। মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় গত ১২ এপ্রিল রাতে ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
এরপর হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে গত ৬ মে প্রথম ক্রুড অয়েল নিয়ে দেশে আসে ‘এমটি নিনেমিয়া’। পরে ২২ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে এক লাখ টন ক্রুড নিয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছে ‘এমটি ফসিল’। ১৭ জুন আবারও ক্রুড অয়েলের চালান নিয়ে দেশে আসে ‘এমটি নিনেমিয়া’। এছাড়া সৌদি আরবের রাসতানুরা বন্দর থেকে ক্রুড নিয়ে আসার পথে ৩ মার্চ আটকে পড়া ‘এমটি নর্ডিক পোলাক্স’ জাহাজও দেশে পৌঁছেছে।
বিএসসি জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে ক্রুড অয়েলের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং বড় ধরনের সংকট নেই।
সানা/আপ্র/৩১/৭/২০২৬