ফাইনালে উঠতে জয়ের বিকল্প ছিল না। টস জিতে আগে ব্যাটিং নিয়ে বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল অন্তত ৪১ রানের ব্যবধানে জয়। কিন্তু সেই সমীকরণ মেলানো তো দূরের কথা, ব্যাটিং বিপর্যয়ে ১৬০ রানেই গুটিয়ে গেল দল। জবাবে ৮৭ বল হাতে রেখে ৭ উইকেটে জিতে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল নিশ্চিত করেছে আফগানিস্তান। টানা দুই হারে প্রাথমিক পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হলো বাংলাদেশকে।
শারজাহতে বুধবারের (২১ অক্টোবর) এই পরাজয়ে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টানা পাঁচটি ওয়ানডেতে হারল বাংলাদেশ। শুক্রবারের ফাইনালে আফগানিস্তানের প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে। অন্যদিকে, বিশ্বকাপের এক বছরও বাকি নেই। এমন সময়ে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ধারাবাহিক ব্যর্থতা দলের ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
বাংলাদেশের ব্যাটিং দুর্দশার সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্কোরকার্ড। চোট পাওয়া লিটন দাসের বদলে সুযোগ পাওয়া পারভেজ হোসেন ইমন খেলেছেন ৭০ রানের ইনিংস। ধীরগতির ব্যাটিংয়ে সাইফ হাসানের অবদান ৪১ রান। অতিরিক্তসহ এই দুজনের বাইরে দলের বাকি ব্যাটসম্যানদের সম্মিলিত সংগ্রহ মাত্র ২৭ রান। চারজন ফিরেছেন শূন্য হাতে।
শুরুর বিপর্যয় সামলে সাইফ ও পারভেজের ৯৩ রানের জুটি বাংলাদেশকে লড়াইয়ে ফেরার আশা দেখিয়েছিল। কিন্তু বাজে শটে সাইফের বিদায়ের পর আবারো ভেঙে পড়ে ইনিংস। শেষ ছয় উইকেট হারাতে বাংলাদেশ যোগ করতে পেরেছে মাত্র ৩৯ রান।
আফগানিস্তানের হয়ে চার উইকেট নিয়েছেন রাশিদ খান। নতুন বলে দুটি করে উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে শুরুতেই ধস নামান পেসার ইয়ামিন আহমাদজাই ও আজমাতউল্লাহ ওমারজাই।
শুরুতেই জোড়া ধাক্কা, বিপর্যয়ে বাংলাদেশ
শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয় বলেছিলেন, দলের ভেতরে সব ঠিকঠাক আছে, শুধু ভালো শুরু চান তারা। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারেই দুই উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
একাদশে তিন পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামা দল ব্যাটিং অর্ডারেও পরিবর্তন আনে। তানজিদ হাসানের সঙ্গে ইনিংস শুরু করেন সাইফ হাসান। তিন নম্বরে নামেন সৌম্য সরকার। তবে নতুন এই বিন্যাস কাজে আসেনি।
ইয়ামিন আহমাদজাইয়ের অফ স্টাম্প ঘেঁষা বলে উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন তানজিদ। পরের বলেই অফ স্টাম্পের অনেক বাইরের ডেলিভারি স্টাম্পে টেনে এনে বোল্ড হন সৌম্য। অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যানের পা একটুও নড়েনি।
এরপর নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাট থেকে তিনটি বাউন্ডারি এলেও আবারো এক ওভারে জোড়া ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। অফ স্টাম্পের বাইরের বলে কয়েকবার খোঁচা দিয়েও অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া শান্ত শেষ পর্যন্ত ১৫ রানে একই ধরনের বলে আজমাতউল্লাহ ওমারজাইয়ের শিকার হন। ওই ওভারেই ফ্লিক করতে গিয়ে ফিরতি ক্যাচ দেন হৃদয়। ফলো থ্রুতে এক হাতে দুর্দান্ত রিফ্লেক্সে ক্যাচটি নেন ওমারজাই।
সাত ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় চার উইকেটে ২৮ রান।
সাইফ-পারভেজের জুটিতে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা
দলকে বিপর্যয় থেকে টেনে তোলার দায়িত্ব নেন সাইফ ও পারভেজ। দুজনই মূলত উইকেট আঁকড়ে রেখে ব্যাটিং করেন। রানের গতি ছিল মন্থর, তবে আলগা বল পেলে বাউন্ডারি আদায় করে নিচ্ছিলেন। তাদের প্রতিরোধে বাংলাদেশের নিভে আসা আশায় আবারো আলো দেখা দেয়।
৭৫ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন পারভেজ। ওয়ানডেতে চতুর্থ ম্যাচ খেলতে নেমে এটি তার দ্বিতীয় অর্ধশতক। দুজনের জুটিতে দলের সংগ্রহ ১২০ ছাড়িয়ে গেলে দৃষ্টি চলে যায় আড়াইশ রানের সম্ভাবনার দিকে।
কিন্তু ঠিক সেই সময় উইকেটের পরিস্থিতি বিবেচনা না করে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে মোহাম্মাদ নাবিকে উড়িয়ে মারতে যান সাইফ। ৮২ বলে ৪১ রান করে শেষ হয় তার ইনিংস। সেখান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের পরবর্তী ধস। অসুস্থতা কাটিয়ে দলে ফেরা মেহেদী হাসান মিরাজ পরের ওভারেই ফিরে যান।
এরপর রাশিদ খানের ঘূর্ণিতে দ্রুত ভেঙে পড়ে ইনিংসের বাকি অংশ। প্রথম ছয় ওভারে উইকেট না পাওয়া রাশিদ শরিফুল ইসলামকে বোল্ড করার পর এলবিডব্লিউ করেন পারভেজকে। পরে অভিষিক্ত আলিস আল ইসলাম ও মুস্তাফিজুর রহমানকে টানা দুই বলে ফিরিয়ে বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তি টানেন তিনি।
পারভেজের ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস না হলে বাংলাদেশের স্কোর আরো বিপর্যয়কর হতে পারত। তবে দলকে লড়াইয়ের মতো অবস্থানে নেওয়ার সুযোগ পেয়েও ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বহীনতায় সেই সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।
তাসকিনের আঘাতেও ম্যাচে ফেরেনি বাংলাদেশ
১৬১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে আফগানিস্তানও শুরুতে দুটি উইকেট হারায়। তাসকিন আহমেদ দারুণ দুটি ডেলিভারিতে রহমানউল্লাহ গুরবাজ ও সেদিকউল্লাহ আটালকে ফিরিয়ে দেন। তবে লক্ষ্য ছোট হওয়ায় আফগান ব্যাটসম্যানদের ওপর বড় কোনো চাপ তৈরি হয়নি।
তৃতীয় উইকেটে ৫৬ রান যোগ করেন ইব্রাহিম জাদরান ও রেহমত শাহ। ৩৪ রান করে ইব্রাহিম মুস্তাফিজুর রহমানের বলে আউট হন। নাজমুল হোসেন শান্ত নেন দুর্দান্ত ক্যাচটি। কিন্তু ততক্ষণে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই আফগানিস্তানের হাতে চলে গেছে।
এরপর রেহমত শাহ ও হাশমাতউল্লাহ শাহিদি অবিচ্ছিন্ন জুটিতে যোগ করেন ৬৬ রান। আফগানিস্তানের বর্তমান ও সাবেক অধিনায়কের এই জুটিই দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেয়। ৬৭ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন রেহমত। ৩৩ রানে অপরাজিত থাকেন শাহিদি।
বহুল প্রতীক্ষিত ওয়ানডে অভিষেকে আলিস আল ইসলাম খুব বেশি প্রভাব রাখতে পারেননি। তবে দলের ব্যাটিং ব্যর্থতার পর এককভাবে তার দিকে আঙুল তোলার সুযোগ নেই। বরং পুরো দলের ব্যাটিং পরিকল্পনা, উইকেটের পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার সক্ষমতা এবং চাপ সামলানোর দুর্বলতাই আবারো সামনে এসেছে।
বিশ্বকাপের এক বছরও বাকি নেই। এমন সময়ে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের টানা ব্যর্থতা শুধু একটি সিরিজ থেকে বিদায়ের ঘটনা নয়; সামনে বড় প্রতিযোগিতায় দলের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ৪১.২ ওভারে ১৬০ রান। সাইফ ৪১, তানজিদ ১, সৌম্য ০, শান্ত ১৫, হৃদয় ০, পারভেজ ৭০, মিরাজ ২, শরিফুল ৭, আলিস ০, তাসকিন ২॥ ও মুস্তাফিজ ০। ওমারজাই ৭-০-২৭-২, ইয়ামিন ৬-০-২১-২, বিলাল ৬-০-২৩-১, গাজানফার ৫-০-১২-০, রাশিদ ৮.২-০-৩১-৪, নাবি ৯-০-৩৫-১।
আফগানিস্তান: ৩৫.৩ ওভারে ১৬৩/৩। গুরবাজ ৬, জাদরান ৩৪, আটাল ৪, রেহমত ৬৭॥ ও শাহিদি ৩৩॥। তাসকিন ৮-২-৩৬-২, শরিফুল ৫-১-১৮-০, আলিস ৮.৩-০-৪৯-০, মুস্তাফিজ ৬-১-৩২-১, মিরাজ ৮-০-২৫-০।
ফল: আফগানিস্তান ৭ উইকেটে জয়ী।
সানা/আপ্র/২২/১০/২০২৬