মানবসভ্যতার ইতিহাসে ভাষার বৈচিত্র্য ছিল আজকের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু সাম্রাজ্য বিস্তার, ঔপনিবেশিক শাসন এবং প্রভাবশালী ভাষার আধিপত্যের কারণে বিশ্বের হাজারো ভাষা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মানব ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিশ্বে একসঙ্গে ৩০ হাজার থেকে ৭৫ হাজারের বেশি ভাষার অস্তিত্ব ছিল।
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় গণিতভিত্তিক মডেল, ভাষাবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান ও জনমিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রায় ১২ হাজার বছর আগে বরফযুগের শেষভাগ থেকে ভাষার বিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ থেকে খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পৃথিবীতে ভাষাবৈচিত্র্যের এক ধরনের ‘স্বর্ণযুগ’ ছিল। ওই সময়ে মানবজাতি একসঙ্গে ১০ হাজারের বেশি ভাষা ব্যবহার করত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বড় বড় সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং গত কয়েক শতকের ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার কারণে ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করে।
গবেষণার প্রধান গবেষক যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্লেয়ার বাওয়ার্ন বলেন, একটি ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এর ভেতরে একটি জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে।
তিনি বলেন, ভাষা মানুষের অতীত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। মানুষ কোথায় বসবাস করত, কী খেত এবং কীভাবে চিন্তা করত-এসব বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে ভাষা বিজ্ঞানীদের অনন্য সুযোগ দেয়।
গবেষণার মূল লেখক ও স্পেনভিত্তিক কাতালান ইনস্টিটিউশন ফর রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভান্সড স্টাডিজের জ্ঞানবিজ্ঞানী ও বিবর্তনমূলক নৃবিজ্ঞানী ড্যামিয়ান ব্লাসি বলেন, কয়েক হাজার বছর আগেও মানবজাতি বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময় এক পৃথিবীতে বসবাস করত।
গবেষকেরা জানান, প্রাচীন ভাষার সরাসরি লিখিত প্রমাণ না থাকায় তারা বিভিন্ন তথ্য ও বৈজ্ঞানিক মডেলের সহায়তা নিয়েছেন। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১৭১টি শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা ভাষার বিকাশ ও বিলুপ্তির সম্ভাব্য চিত্র তৈরি করেন।
তাদের ধারণা, প্রায় ১২ হাজার বছর আগে হলোসিন যুগের শুরুতে বিশ্বে সাড়ে চার হাজার থেকে ছয় হাজার ২০০টির মতো ভাষা প্রচলিত ছিল। পরবর্তী সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিভিত্তিক স্থায়ী বসতি এবং নতুন নতুন সামাজিক গোষ্ঠীর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার সংখ্যাও বেড়ে যায়।
ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সুমেরীয়, আক্কাদীয়, হিট্টিট, এট্রুস্কানসহ বহু ভাষা হারিয়ে গেছে। একইভাবে আফ্রিকা, আমেরিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য স্থানীয় ভাষাও বিলুপ্ত হয়েছে।
অধ্যাপক বাওয়ার্ন বলেন, কোনো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বিলুপ্ত হয়ে গেলে অথবা তারা অন্য কোনো ভাষায় পুরোপুরি স্থানান্তরিত হলে একটি ভাষার মৃত্যু ঘটে। তবে সব সময় ভাষা সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় না; অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ভাষার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন ভাষার জন্ম হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি লাতিন ভাষার কথা উল্লেখ করেন, যা পরিবর্তিত হয়ে ফরাসি, ইতালীয় ও স্প্যানিশের মতো আধুনিক ভাষার জন্ম দিয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ভাষা বিলুপ্তির পেছনে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ‘ভাষাগত সাম্রাজ্যবাদ’ বড় ভূমিকা রেখেছে। আয়ারল্যান্ডে ইংরেজ শাসনের সময় আইরিশ ভাষার ওপর দমননীতি চালানো হয়। আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে স্প্যানিশ ও ব্রাজিলে পর্তুগিজ শাসকেরা স্থানীয় আদিবাসী ভাষাকে দমনের চেষ্টা করে। আফ্রিকায় ফরাসি ভাষা চাপিয়ে দেওয়া এবং কোরিয়ায় জাপানি শাসকদের ভাষানীতি স্থানীয় ভাষার ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
তবে সব ভাষা হারিয়ে যায়নি। দমন-পীড়নের পরও ইনকা, মায়া ও অ্যাজটেকদের ভাষাসহ কিছু আদিবাসী ভাষা এখনো টিকে আছে।
গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমানে বিশ্বের ব্যবহৃত ভাষার প্রায় অর্ধেকই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মাত্র ১০ শতাংশ ভাষায় কথা বলেন। ফলে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা ও ইশারা ভাষাগুলো বক্তার সংখ্যা কমে যাওয়ায় ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সূত্র: রয়টার্স, সায়েন্স সাময়িকী
সানা/ডিসি/আপ্র/২৯/৭/২০২৬