গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

খাদ্য যখন আতঙ্কের নাম, রাষ্ট্র তখন নীরব থাকতে পারে না

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১১:৪৫ পিএম, ০৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ০১:৩৩ এএম ২০২৬
খাদ্য যখন আতঙ্কের নাম, রাষ্ট্র তখন নীরব থাকতে পারে না
ছবি

ফাইল ছবি

একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নাগরিকের নিরাপত্তা। সেই নিরাপত্তা কেবল সীমান্ত, আইনশৃঙ্খলা বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যও এর অন্যতম মৌলিক উপাদান। যে খাদ্য জীবন রক্ষা করবে, পুষ্টি জোগাবে এবং সুস্থ ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ করবে, সেই খাদ্যই যদি রোগ, অক্ষমতা ও মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে, তবে তা শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, সুশাসন এবং উন্নয়নের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আজ বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি ঠিক এমন এক সংকটময় পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এবং ৮৬ কোটিরও বেশি মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিপদের বড় অংশের শিকার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। খাদ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবীর পাশাপাশি রাসায়নিক দূষণ এখন মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আর্সেনিক, সিসা এবং অন্যান্য বিষাক্ত উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হৃদরোগ, ক্যানসার ও জটিল অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই সতর্কবার্তা কেবল বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও এক গভীর সতর্কসংকেত।

দেশের বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি তথ্য বলছে, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। অসংখ্য মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন, চিকিৎসা ব্যয়ের ভারে বিপর্যস্ত হচ্ছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। শিশুদের পুষ্টিহীনতা, শারীরিক বিকাশে বাধা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অর্থাৎ অনিরাপদ খাদ্য কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যহানির কারণ নয়-এটি জাতীয় মানবসম্পদকে দুর্বল করে দেয়, উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং উন্নয়নের ভিতকে ক্ষয় করে।

সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী যথার্থভাবেই বলেছেন, “জিলাপি খেয়ে আতঙ্কে ভোগা” কোনো স্বাভাবিক দেশের চিত্র হতে পারে না। কথাটি নিছক রসিকতা নয়; এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আজ সাধারণ মানুষ ফল কিনতে ভয় পায়, মাছ-মাংসের মান নিয়ে সন্দিহান থাকে, মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবার খেতে গেলেও রাসায়নিকের আশঙ্কা তাড়া করে। একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় আস্থার সংকট আর কী হতে পারে? যখন নাগরিক প্রতিদিনের আহার নিয়েও নিশ্চিন্ত হতে পারে না, তখন উন্নয়নের পরিসংখ্যানের অনেক অর্জনই ম্লান হয়ে যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, অনিরাপদ খাদ্যের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই এখনো অনেকাংশে মৌসুমি। উৎসব বা বিশেষ সময়ে অভিযান পরিচালনা, জরিমানা আর কিছু প্রতীকী শাস্তি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত সমগ্র খাদ্যশৃঙ্খলকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক পরীক্ষাগারের সংখ্যা বাড়ানো, জনবল সংকট দূর করা, ডিজিটাল অনুসরণব্যবস্থা চালু করা এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়-এটি সাংবিধানিক অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে বিশুদ্ধ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পায় না। তাই অনিরাপদ খাদ্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে আর বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে জাতীয় অগ্রাধিকার, জনস্বাস্থ্য আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ খাদ্য যখন আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের নীরবতা শুধু ব্যর্থতাই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক গুরুতর অবিচার। 
সানা/আপ্র/৭/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

শুধু হুঁশিয়ারি নয়, হাসপাতালে অনিয়ম বন্ধে চাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুধু হুঁশিয়ারি নয়, হাসপাতালে অনিয়ম বন্ধে চাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা

সরকারি হাসপাতাল মানুষের শেষ ভরসা। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাবের সময়ে অসুস্থ মানুষ যখন সর...

৯/১১-এর ২৫ বছরে যুদ্ধ বেড়েছে, সন্ত্রাসের শিকড় কি কেটেছে?
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯/১১-এর ২৫ বছরে যুদ্ধ বেড়েছে, সন্ত্রাসের শিকড় কি কেটেছে?

২৫ বছর আগে ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, বদলে দিয়েছিল গোটা বিশ্বের ন...

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার

প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। বর্তমান সময়ে আত্মহত্যার মতো একটি স...

শত পুলিশেও নিরাপত্তা নেই—এ কোন চাঁদাবাজির দুঃসাহস
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শত পুলিশেও নিরাপত্তা নেই—এ কোন চাঁদাবাজির দুঃসাহস

চট্টগ্রামে এক চিকিৎসকের কাছে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীর পরিচয়ে প্রথমে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, নির্ধারিত...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই