গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

মেনু

সনদ নয়, দক্ষতাই হোক শিক্ষার নতুন মানদণ্ড

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:৫৩ পিএম, ০৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ০৮:০৯ এএম ২০২৬
সনদ নয়, দক্ষতাই হোক শিক্ষার নতুন মানদণ্ড
ছবি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুরুত্বারোপ সময়োপযোগী এবং নীতিগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ -ফাইল ছবি

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, অন্যদিকে শিক্ষিত বেকারত্বও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী সনদ অর্জন করে কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের একটি বড় অংশ উপযুক্ত কর্মসংস্থান খুঁজে পায় না। একই সময়ে শিল্প ও সেবাখাতের উদ্যোক্তারা দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতির কথা বলছেন। এই বৈপরীত্য কেবল শ্রমবাজারের সমস্যা নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনীতির মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার প্রতিফলন। এমন বাস্তবতায় সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুরুত্বারোপ সময়োপযোগী এবং নীতিগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বিশ্বব্যাপী চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অভিঘাতে কর্মসংস্থানের চরিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, জীবপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং তথ্যভিত্তিক অর্থনীতি নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। বহু প্রচলিত পেশা সংকুচিত হচ্ছে, আবার সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে কোনো দেশই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি অনিবার্য বাস্তবতা। ফলে শিক্ষাকে আর কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক বা সনদমুখী কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো জ্ঞান ও দক্ষতার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তব প্রয়োগ, সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলস্বরূপ শিক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পরও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা পূরণে তারা প্রস্তুত থাকে না। এই অবস্থার পরিবর্তনে পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষাদানের ধরনে মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।

বিশেষভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা নেটওয়ার্কের অধীনে অধ্যয়নরত লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই বিশাল শিক্ষাব্যবস্থাকে দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর অংশীদারত্ব, বাধ্যতামূলক শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং কর্মমুখী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় প্রয়োজন।

তবে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বলতে কেবল প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণকে বোঝালে ভুল হবে। আধুনিক বিশ্বে একজন সফল নাগরিকের জন্য যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, সৃজনশীলতা, আর্থিক সচেতনতা, দলগত কাজের সক্ষমতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরো একটি বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত উদ্ভাবন অনুদান এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগও বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। কারণ উন্নত অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উদ্ভাবননির্ভর উদ্যোক্তা সংস্কৃতি। তরুণদের কেবল চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে তা জাতীয় অর্থনীতিকে নতুন গতিশীলতা দেবে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবায়ন। অতীতে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে বহু পরিকল্পনা ও ঘোষণা এসেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কাঙিক্ষত ফল অর্জিত হয়নি। তাই এবার প্রয়োজন সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, আধুনিক অবকাঠামো এবং ধারাবাহিক তদারকি। নীতিগত অঙ্গীকারকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপান্তর করতে না পারলে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার লক্ষ্যও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনসংখ্যাকে যদি যুগোপযোগী জ্ঞান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং পেশাগত দক্ষতায় সমৃদ্ধ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবে সেটিই হবে দেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। সময়ের দাবি হলো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা শুধু সনদ প্রদান করবে না; বরং দক্ষতা সৃষ্টি করবে, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে এবং বৈশ্বিক বাস্তবতার উপযোগী আত্মবিশ্বাসী নাগরিক তৈরি করবে। কারণ একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে সনদ সুযোগের দরজা খুলতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা তৈরি করে কেবল দক্ষতাই।
সানা/আপ্র/৯/৬/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

টুথপেস্টেও বিষের ছোবল, এখনই চাই কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
২৮ জুলাই ২০২৬

টুথপেস্টেও বিষের ছোবল, এখনই চাই কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ

মানুষ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যে কাজটি সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে করে,...

উন্নয়নের নামে ঢাকার অস্তিত্ব বিপন্ন করা যাবে না
২৭ জুলাই ২০২৬

উন্নয়নের নামে ঢাকার অস্তিত্ব বিপন্ন করা যাবে না

রাজধানী ঢাকা আজ এক গভীর নগর সংকটের মুখোমুখি। জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ুদূষণ, জল...

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব
২৬ জুলাই ২০২৬

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পরিবর্তন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি একদিকে যেমন একটি ব্যক্তিগত বাস্...

জ্বালানি নিরাপত্তায় আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই
২৫ জুলাই ২০২৬

জ্বালানি নিরাপত্তায় আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল সেতু, সড়ক বা উঁচু ভবন নির্মাণে পরিমাপ করা যায় না; নাগরিকের ঘরে চুলা জ্বলে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই