গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

মেনু

বিশ্বকাপের মহামঞ্চে মানবতার মিলনবার্তা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৪:৫৮ পিএম, ১২ জুন ২০২৬ | আপডেট: ০৪:৫৪ এএম ২০২৬
বিশ্বকাপের মহামঞ্চে মানবতার মিলনবার্তা
ছবি

মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে যে যাত্রার সূচনা হয়েছে, তা নিছক একটি প্রতিযোগিতার নয়; এটি বিশ্বমানবতার সম্মিলিত স্বপ্ন, উচ্ছ্বাস, সংস্কৃতি ও সহাবস্থানের এক অনন্য উদ্যাপন -ছবি রয়টার্স

পৃথিবী আজ আবারো এক অভিন্ন আবেগে স্পন্দিত। ভাষা, ভূগোল, সংস্কৃতি, জাতিগত পরিচয় ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে কোটি কোটি মানুষ চোখ রেখেছে একটি সবুজ মাঠের দিকে। চার বছরের প্রতীক্ষার পর শুরু হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপ-এমন এক আয়োজন, যা কেবল ক্রীড়ার সর্বোচ্চ আসর নয়, বরং মানবসভ্যতার অন্যতম বৃহত্তম মিলনমঞ্চ। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে যে যাত্রার সূচনা হয়েছে, তা নিছক একটি প্রতিযোগিতার নয়; এটি বিশ্বমানবতার সম্মিলিত স্বপ্ন, উচ্ছ্বাস, সংস্কৃতি ও সহাবস্থানের এক অনন্য উদ্যাপন।

বিশ্ব এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, যখন যুদ্ধ, সংঘাত, বিভাজন, বৈরিতা এবং অবিশ্বাস প্রায় প্রতিদিনই আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে অস্থির করে তুলছে। নানা সংকট ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভারে ন্যুব্জ এই পৃথিবীতে বিশ্বকাপ যেন এক বিরল আলোকবর্তিকা, যা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়-ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমরা একই মানবপরিবারের অংশ। ফুটবল সেই ভাষা, যার কোনো অনুবাদ প্রয়োজন হয় না; যার উচ্ছ্বাস সীমান্ত চেনে না; যার আনন্দ ধর্ম, বর্ণ কিংবা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না।

এবারের বিশ্বকাপ ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়ও রচনা করেছে। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ যৌথভাবে এই মহাযজ্ঞের আয়োজন করছে। অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছেছে আটচল্লিশে। ফলে বিশ্বকাপ আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, আরো বৈচিত্র্যময় এবং আরো প্রতিনিধিত্বশীল। এই বিস্তৃতি কেবল পরিসংখ্যানের নয়; এটি বিশ্ব ক্রীড়ার গণতান্ত্রিক বিকাশেরও প্রতীক। ছোট-বড়, শক্তিশালী-দুর্বল, ঐতিহ্যবাহী-নবাগত-সবাইকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বিশ্বকাপের প্রকৃত মহত্ত্ব।

আজতেকার উদ্বোধনী আয়োজন ছিল সেই মানবিক ঐক্যেরই এক মনোমুগ্ধকর প্রতিচ্ছবি। প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহ্য, আদিবাসী সংস্কৃতির গৌরব, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময় এবং বিশ্বসংগীতের সুরধারা একত্রিত হয়ে যেন ঘোষণা করেছে-নিজস্ব পরিচয়কে ধারণ করেই বিশ্বজনীন হওয়া সম্ভব। সংস্কৃতির এই সম্মিলন বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে: বৈচিত্র্য কোনো বিভাজনের কারণ নয়; বরং সেটিই মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় শক্তি।

মাঠের লড়াইও সেই আবেগকে আরো উজ্জ্বল করেছে। উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর জয় তাদের সমর্থকদের আনন্দে ভাসিয়েছে। তবে ফলাফলের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিযোগিতার সেই চিরন্তন সৌন্দর্য, যেখানে প্রতিটি দল স্বপ্ন দেখে, প্রতিটি খেলোয়াড় নিজের দেশের আশা বুকে ধারণ করে মাঠে নামে এবং প্রতিটি সমর্থক বিশ্বাস করে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। এই বিশ্বাসই বিশ্বকাপকে কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং মানুষের অদম্য সম্ভাবনার প্রতীক করে তুলেছে।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানবিক প্রভাব। এই আসর আমাদের শেখায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু শত্রুতা নয়; মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়। একই মাঠে বিভিন্ন ভাষার, বিভিন্ন সংস্কৃতির, বিভিন্ন ইতিহাসের মানুষ যখন করতালিতে মুখর হয়, তখন মানবসভ্যতার সবচেয়ে সুন্দর রূপটি আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। বিশ্বকাপ তাই গোল, জয় বা ট্রফির হিসাবের চেয়েও অনেক বড় কিছু; এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা, বন্ধুত্ব ও বিশ্বসংহতির এক জীবন্ত প্রতীক।

আগামী দিনগুলোতে এই বিশ্বমঞ্চে জন্ম নেবে নতুন ইতিহাস, নতুন নায়ক, নতুন বিস্ময় এবং নতুন স্মৃতি। কেউ জিতবে, কেউ হারবে; কেউ আনন্দে ভাসবে, কেউ বেদনায় কাঁদবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিজয়ী হওয়া উচিত সেই মানবিক চেতনা, যা কোটি মানুষকে একসঙ্গে হাসতে, স্বপ্ন দেখতে এবং উদ্যাপন করতে শেখায়।

আজতেকার আকাশে যে আলোর মশাল প্রজ্বলিত হয়েছে, তা কেবল একটি টুর্নামেন্টের সূচনার প্রতীক নয়; এটি বিভক্ত পৃথিবীতে ঐক্যের আহ্বান, সংঘাতময় সময়ে সহমর্মিতার বার্তা এবং মানবতার প্রতি নতুন আস্থার ঘোষণা। বিশ্বকাপের মহামঞ্চ থেকে তাই উচ্চারিত হোক একটাই অঙ্গীকার-প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু মানবতা হবে সর্বোচ্চ বিজয়ী; ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু ঐক্যই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
সানা/আপ্র/১২/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

উন্নয়নের নামে ঢাকার অস্তিত্ব বিপন্ন করা যাবে না
২৭ জুলাই ২০২৬

উন্নয়নের নামে ঢাকার অস্তিত্ব বিপন্ন করা যাবে না

রাজধানী ঢাকা আজ এক গভীর নগর সংকটের মুখোমুখি। জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ুদূষণ, জল...

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব
২৬ জুলাই ২০২৬

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পরিবর্তন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি একদিকে যেমন একটি ব্যক্তিগত বাস্...

জ্বালানি নিরাপত্তায় আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই
২৫ জুলাই ২০২৬

জ্বালানি নিরাপত্তায় আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল সেতু, সড়ক বা উঁচু ভবন নির্মাণে পরিমাপ করা যায় না; নাগরিকের ঘরে চুলা জ্বলে...

ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিন
২৩ জুলাই ২০২৬

ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিন

হামে শিশুমৃত্যু আটশ অতিক্রম

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই