গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

মেনু

মামলাজটের শৃঙ্খল ভেঙেই গড়তে হবে কল্যাণ রাষ্ট্র

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৮:২২ পিএম, ০৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৩:০৬ এএম ২০২৬
মামলাজটের শৃঙ্খল ভেঙেই গড়তে হবে কল্যাণ রাষ্ট্র
ছবি

ছবি সংগৃহীত

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু প্রবৃদ্ধির হার, অবকাঠামোর বিস্তার কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো আইনের শাসন, সময়োপযোগী ন্যায়বিচার এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার সক্ষমতা। যে রাষ্ট্রে একজন নাগরিক ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বছরের পর বছর, কখনো কখনো যুগের পর যুগ আদালত কিংবা সরকারি দপ্তরের বারান্দায় ঘুরে বেড়ান, সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন যতই দৃশ্যমান হোক না কেন, সেখানে ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা অপূর্ণ।

জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান যে তথ্য তুলে ধরেছেন, তা সেই অপূর্ণতারই নির্মম প্রতিচ্ছবি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের একত্রিশ মার্চ পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতেই রয়েছে ৪০ লাখের বেশি মামলা। আবার পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা কয়েক লাখ দেওয়ানি মামলার অস্তিত্ব প্রমাণ করে, বিচার বিলম্ব আর ব্যতিক্রম নয়; বরং তা একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় বিচারপ্রার্থী যেমন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা।

তবে এই পরিসংখ্যানও প্রকৃত চিত্রের একটি অংশমাত্র। কারণ আইনমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব কেবল আদালতের বিচারাধীন মামলার। আদালতের বাইরেও ভূমি প্রশাসন, রাজস্ব বিভাগ, স্থানীয় সরকার, বিভিন্ন ট্রাইব্যুনাল, আপিল কর্তৃপক্ষ এবং অসংখ্য সরকারি দপ্তরে কোটি কোটি আবেদন, আপত্তি, আপিল ও বিরোধ বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন পড়ে আছে। বিশেষ করে ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের কারণে অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হয়েছে, সামাজিক সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। আরো বেদনাদায়ক হলো, এসব মামলার অনেকগুলো আইনের জটিলতায় নয়; বরং নিম্নস্তরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ, উৎকোচ, ফাইল গায়েব করা, ইচ্ছাকৃত কালক্ষেপণ এবং দুর্নীতির কারণে বছরের পর বছর আটকে থাকে। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার এক নীরব প্রক্রিয়া।

সরকার ইতোমধ্যে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম চালু করে কিছু ইতিবাচক ফল পেয়েছে। আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব জেলায় এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে, সেখানে নতুন মামলা দায়েরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দিয়ে এই বিশাল সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রব্যাপী বিচার ও প্রশাসনিক সংস্কারের একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা। বিচারকের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, আদালতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর মামলাপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি সংস্থার অযথা আপিলের প্রবণতা কমানো এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পরিধি সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর জবাবদিহি কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে এখন সময় এসেছে একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের। সরকার নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে অনিষ্পন্ন মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে। প্রথম পর্যায়ে অন্তত দশ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা সব মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কিংবা নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক বিচার কার্যক্রম চালু করা জরুরি। বিশেষ করে ভূমিসংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি আদালতের বাইরের প্রশাসনিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ এবং অযৌক্তিক বিলম্বের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

ন্যায়বিচার কেবল একটি সাংবিধানিক অঙ্গীকার নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার বিশ্বাসের সবচেয়ে দৃঢ় বন্ধন। যে বিচার সময়মতো পৌঁছায় না, তা বহু ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার থাকে না; তা হয়ে ওঠে হয়রানি, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার আরেক নাম। একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে নাগরিকের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো-তিনি জানবেন, তাঁর অধিকার আদায়ে রাষ্ট্র তাঁকে অনন্ত প্রতীক্ষায় রাখবে না। তাই মামলাজটকে আর প্রশাসনিক স্বাভাবিকতা হিসেবে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি এখন জাতীয় উন্নয়ন, সুশাসন ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। এই শৃঙ্খল ভাঙতেই হবে। কারণ মামলাজটের অবসানই কেবল বিচারব্যবস্থাকে গতিশীল করবে না, বরং আইনের শাসনের ভিতকে সুদৃঢ় করে একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র নির্মাণের পথও প্রশস্ত করবে।
সানা/আপ্র/৯/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

টুথপেস্টেও বিষের ছোবল, এখনই চাই কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
২৮ জুলাই ২০২৬

টুথপেস্টেও বিষের ছোবল, এখনই চাই কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ

মানুষ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যে কাজটি সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে করে,...

উন্নয়নের নামে ঢাকার অস্তিত্ব বিপন্ন করা যাবে না
২৭ জুলাই ২০২৬

উন্নয়নের নামে ঢাকার অস্তিত্ব বিপন্ন করা যাবে না

রাজধানী ঢাকা আজ এক গভীর নগর সংকটের মুখোমুখি। জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ুদূষণ, জল...

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব
২৬ জুলাই ২০২৬

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পরিবর্তন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি একদিকে যেমন একটি ব্যক্তিগত বাস্...

জ্বালানি নিরাপত্তায় আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই
২৫ জুলাই ২০২৬

জ্বালানি নিরাপত্তায় আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল সেতু, সড়ক বা উঁচু ভবন নির্মাণে পরিমাপ করা যায় না; নাগরিকের ঘরে চুলা জ্বলে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই