গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

মেনু

সমর্থনের নামে প্রাণহানি নয়, সৌহার্দ্যপূর্ণ ক্রীড়াসংস্কৃতির বিজয় হোক

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৯:২৪ পিএম, ১৬ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৫ এএম ২০২৬
সমর্থনের নামে প্রাণহানি নয়, সৌহার্দ্যপূর্ণ ক্রীড়াসংস্কৃতির বিজয় হোক
ছবি

ছবি সংগৃহীত

খেলা মানুষের জীবনে আনন্দের রং ছড়িয়ে দেয়। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্তরালে থাকে সম্মান, সৌহার্দ্য, সৌন্দর্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। একটি গোলের উল্লাস, একটি দুর্দান্ত রক্ষণ, একটি অসাধারণ পাস কিংবা একটি অবিশ্বাস্য গোলরক্ষার মুহূর্ত-এসবই কোটি মানুষের হৃদয়ে একসঙ্গে আনন্দের ঢেউ তোলে। খেলার এই নির্মল সৌন্দর্যই সভ্যতার অর্জন। অথচ সেই খেলাই যদি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, পরিবারে শোকের ছায়া নামায়, বন্ধুত্ব ভেঙে দেয় এবং সমাজে বিদ্বেষের আগুন ছড়িয়ে দেয়, তবে আমাদের থমকে দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনা করতেই হবে।

চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিচ্ছিন্নভাবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, প্রাণহানির সংখ্যায় বাংলাদেশের শীর্ষে উঠে আসা। যে দেশ এখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার সুযোগ পায়নি, সেই দেশের মানুষ বিদেশি দলগুলোর সমর্থন করতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন, প্রাণ হারাচ্ছেন, এমনকি আত্মহননের পথও বেছে নিচ্ছেন। কুমিল্লায় একটি পেনাল্টি মিস নিয়ে তর্কের জেরে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের সংঘর্ষ, পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু, ভবন থেকে পড়ে প্রাণ হারানো কিংবা প্রিয় দলের পরাজয় মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যার মতো ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক মানসিকতার গভীর সংকটের নির্মম প্রতিফলন।

সমর্থন অবশ্যই ব্যক্তির স্বাধীন পছন্দ। কেউ আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসবেন, কেউ ব্রাজিলকে, কেউ স্পেন, ফ্রান্স কিংবা অন্য কোনো দলকে। ভালো খেলোয়াড়ের প্রশংসা করা, সুন্দর ফুটবল উপভোগ করা এবং প্রিয় দলের বিজয়ে আনন্দ প্রকাশ করা খেলাধুলার স্বাভাবিক সংস্কৃতি। কিন্তু কোনো দলের জয়-পরাজয়কে নিজের সম্মান, আত্মপরিচয় কিংবা অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত করা কখনোই সুস্থ মানসিকতার পরিচয় হতে পারে না। একটি ফুটবল ম্যাচ শেষ হয়ে যায় নব্বই মিনিটে; কিন্তু মানুষের জীবন, সম্পর্ক এবং সামাজিক বন্ধনের মূল্য তার বহু ঊর্ধ্বে।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিবেশ। খেলা শুরুর আগেই পক্ষ-বিপক্ষের বিদ্রূপ, কটূক্তি, অপমান এবং উসকানিমূলক মন্তব্যের বন্যা বয়ে যায়। ভার্চ্যুয়াল জগতের সেই উত্তাপ অনেক সময় বাস্তব জীবনের সম্পর্কেও বিষ ছড়িয়ে দেয়। বন্ধু বন্ধুর বিরুদ্ধে, প্রতিবেশী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে, এমনকি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও অকারণ তিক্ততা তৈরি হয়। মতের ভিন্নতা গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য, কিন্তু মতের অমিল কখনোই বিদ্বেষ, সহিংসতা কিংবা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে না।

আরো উদ্বেগজনক হলো অন্ধ সমর্থনের মানসিকতা। প্রিয় দল হারলেই কেউ কেউ এমনভাবে ভেঙে পড়েন, যেন ব্যক্তিগত জীবনের সব অর্জন এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেছে। কেউ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন, কেউ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেন। এটি আবেগের গভীরতা নয়; বরং আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতার বিপজ্জনক লক্ষণ। খেলা দেখার আগে নিজের মানসিক প্রস্তুতি, সমর্থনের সীমা এবং জয়ের পাশাপাশি পরাজয়ও খেলাধুলার অবিচ্ছেদ্য অংশ-এই সহজ সত্যটি উপলব্ধি করা জরুরি। খেলার ফল কখনোই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।

এই বাস্তবতায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ক্রীড়া সংগঠন এবং রাষ্ট্র-সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। শিশু-কিশোরদের ক্রীড়াসুলভ মনোভাব, সহনশীলতা, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দিতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। খেলাকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণার অস্ত্র নয়, বরং মানুষে মানুষে সম্প্রীতির সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিশ্বকাপ একদিন শেষ হবে, বিজয়ী দল ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে, উল্লাস থেমে যাবে। কিন্তু যদি সেই উৎসবের মূল্য হয় একটি প্রাণ, একটি পরিবার কিংবা একটি সম্পর্কের চিরস্থায়ী ক্ষতি, তবে সেই উল্লাসের কোনো অর্থ থাকে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, খেলার প্রকৃত বিজয় ট্রফিতে নয়, মানুষের হৃদয়ে। তাই সমর্থন থাকুক, উচ্ছ্বাস থাকুক, তর্ক থাকুক-কিন্তু কোনো অবস্থাতেই প্রাণহানি, বিদ্বেষ কিংবা সহিংসতা নয়। বিজয় হোক সৌহার্দ্যপূর্ণ ক্রীড়াসংস্কৃতির, বিজয় হোক মানবিকতার। 
সানা/আপ্র/১৬/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

উন্নয়নের নামে ঢাকার অস্তিত্ব বিপন্ন করা যাবে না
২৭ জুলাই ২০২৬

উন্নয়নের নামে ঢাকার অস্তিত্ব বিপন্ন করা যাবে না

রাজধানী ঢাকা আজ এক গভীর নগর সংকটের মুখোমুখি। জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ুদূষণ, জল...

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব
২৬ জুলাই ২০২৬

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পরিবর্তন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি একদিকে যেমন একটি ব্যক্তিগত বাস্...

জ্বালানি নিরাপত্তায় আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই
২৫ জুলাই ২০২৬

জ্বালানি নিরাপত্তায় আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল সেতু, সড়ক বা উঁচু ভবন নির্মাণে পরিমাপ করা যায় না; নাগরিকের ঘরে চুলা জ্বলে...

ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিন
২৩ জুলাই ২০২৬

ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিন

হামে শিশুমৃত্যু আটশ অতিক্রম

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই