বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পরিবার বছরের পর বছর ধরে যে শিশুপণ্যকে নিরাপত্তা, কোমলতা ও মাতৃত্বের আস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে, সেই জনসন অ্যান্ড জনসন বেবি পাউডারকে ঘিরে সাম্প্রতিক আইনি সমঝোতা বিশ্ববিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ট্যালকমভিত্তিক বেবি পাউডার ব্যবহারে ক্যানসারের ঝুঁকির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান প্রায় ৬৯ হাজার মামলা নিষ্পত্তিতে ৫৫০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব কোনো সাধারণ করপোরেট সিদ্ধান্ত নয়; এটি বহুজাতিক পণ্যের নিরাপত্তা, করপোরেট নৈতিকতা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং ভোক্তা সুরক্ষার প্রশ্নে এক কঠিন সতর্কসংকেত।
জনসন অ্যান্ড জনসন এখনো দাবি করছে, তাদের পণ্যে ক্যানসার সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি ঝুঁকি একেবারেই না থাকে, তবে কেন ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী ট্যালকমভিত্তিক বেবি পাউডার বিক্রি বন্ধ করা হলো? আইনি দায় এড়ানোর কৌশল আর নৈতিক দায়বদ্ধতা এক জিনিস নয়। একটি প্রতিষ্ঠান আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হলেও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৪ সালে ট্যালককে ‘সম্ভবত মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ উপাদান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এই শ্রেণিবিন্যাস চূড়ান্ত দণ্ড নয়, কিন্তু যথেষ্ট সতর্কবার্তা। বিশেষত যখন পণ্যটির প্রধান ব্যবহারকারী শিশু এবং নবজাতক। শিশুর শরীর সবচেয়ে সংবেদনশীল; সেখানে সামান্যতম সম্ভাব্য ঝুঁকিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বহুজাতিক করপোরেট সংস্কৃতির নৈতিক দেউলিয়াত্ব। পুঁজিবাদী মুনাফাকেন্দ্রিক মনস্তত্ত্ব বহু ক্ষেত্রেই মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে গৌণ করে তোলে। ইতিহাস সাক্ষী, তামাক, অ্যাসবেস্টস, ক্ষতিকর রাসায়নিক, দূষণকারী শিল্পপণ্য কিংবা নানা ওষুধের ক্ষেত্রে বড় বড় কোম্পানি সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও তা আড়াল করেছে, গবেষণার ফল নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে অথবা বাজার ধরে রাখতে দীর্ঘদিন মিথ্যাচার চালিয়ে গেছে। বিপুল অর্থবল, আইনি শক্তি ও বিজ্ঞাপনী প্রভাব ব্যবহার করে তারা এমন এক বিশ্বাসের আবরণ তৈরি করে, যেখানে ভোক্তারা ধরে নেন-নামি ব্র্যান্ড মানেই নিরাপদ পণ্য। জনসন বিতর্ক সেই ধারণাকে ভয়াবহভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা এই উদ্বেগকে আরো তীব্র করে। জনসন অ্যান্ড জনসনের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতে গেলে ক্রেতাকে প্রায়ই এক অদ্ভুত বিভ্রান্তির মুখোমুখি হতে হয়। এক দোকানদার অন্য দোকানের পণ্যকে নকল বলে দাবি করেন, আবার নিজেরটিকেই ‘আসল’ বলে প্রচার করেন। একই পণ্যের মোড়ক, দাম, আমদানিকারক ও মান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, কেন একজন অভিভাবককে শিশুর জন্য পণ্য কিনতে গিয়ে এমন অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার মধ্যে পড়তে হবে? কেন একটি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রেও ভোক্তাকে আসল-নকল যাচাইয়ের যন্ত্রণায় পড়তে হবে?
এই পরিস্থিতি শুধু বাজারের বিশৃঙ্খলা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় তদারকির দুর্বলতারও প্রতিফলন। কোনো পণ্যের নিরাপত্তা তার বিজ্ঞাপন, আন্তর্জাতিক পরিচিতি বা ব্র্যান্ডমূল্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। প্রত্যেক দেশের সরকারকে শিশুপণ্য ও প্রসাধনীর মান নিয়ন্ত্রণে আরো কঠোর, বৈজ্ঞানিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমদানিকৃত পণ্যের বাধ্যতামূলক উপাদান পরীক্ষা, স্বাধীন গবেষণাগারের মান যাচাই, নকল ও নিম্নমানের পণ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ভোক্তাকে পূর্ণ তথ্য জানানোর আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি।
ভোক্তা যেন শুধু নামিদামি ব্র্যান্ড দেখে পণ্য কিনে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতেই হবে। শিশুর স্বাস্থ্য কোনো বিপণন কৌশলের অংশ নয়, কোনো করপোরেট মুনাফার পরীক্ষাগারও নয়। মাতৃত্বের বিশ্বাসকে পুঁজি করে সামান্যতম সম্ভাব্য ঝুঁকিও আড়াল করা হলে তা কেবল আইনি নয়, সভ্যতারও ব্যর্থতা। পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা করপোরেট মুনাফার চেয়ে অসীম মূল্যবান। তাই আজ প্রয়োজন আপসহীন জবাবদিহি, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং স্পষ্ট বার্তা-শিশুস্বাস্থ্যের সঙ্গে মুনাফার নির্মম আপস আর কখনো চলতে দেওয়া যাবে না।
সানা/আপ্র/৩০/৭/২০২৬