একবিংশ শতাব্দীতেও মানবপাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ মানবসভ্যতার কপালে এক কলঙ্কের তিলক হয়ে বিঁধে আছে। এটি কেবল কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রতি এক মারাত্মক হুমকি। উন্নত জীবনের মিথ্যা স্বপ্ন, লোভনীয় চাকরির প্রলোভন কিংবা অভাবের সুযোগ নিয়ে চক্রগুলো নারী, শিশুসহ সহজ-সরল মানুষকে পাচার করে দিচ্ছে নরকে। দেশের সীমানা পেরিয়ে এই অন্ধকার জালের বিস্তার মানবসমাজকে আজ এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে- যার বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বলা বহুল্য, মানবপাচারের ভয়াবহ রমরমা ব্যবসার পেছনে মূলত কাজ করে সামাজিক অসচেতনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, তীব্র দারিদ্র্য ও অপরাধচক্রের সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে কর্মহীন ও অসহায় সব মানুষ দালালদের খপ্পরে খুব সহজেই পড়ে যায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কিছু ক্ষেত্রে তদারকির অভাব ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়- যা এই অপরাধের শিকড় আরো গভীরে প্রোথিত করতে সাহায্য করছে। আন্তর্জাতিক অপরাধের অংশ হিসেবে পাচারকারীরা মানবজীবনকে পণ্যে পরিণত করে অবৈধ অর্থ উপার্জন করছে- যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও চরম ক্ষতিকর।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও কঠোর সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমেই কেবল একটি মানবপাচারমুক্ত নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব। এই অভিশাপ থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে বহুমুখী ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, মানবপাচার প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে- যাতে কোনো অপরাধীই আইনি ফাঁকফোকর গলে শাস্তি এড়াতে না পারে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো ও গোয়েন্দা তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে। তবে কেবল প্রশাসনিক কঠোরতাই যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে- যাতে কেউ লোভনীয় প্রলোভনে পা না দেয়। গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে কাজ করে মানুষের মধ্যে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। তাই আমদের প্রত্যাশা, মানবপাচার রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ দ্রুত নিশ্চিত করবে সরকার।
কেএমএএ/আপ্র/৩০.০৭.২০২৬