গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

এক কমলাগাছ থেকে সাড়ে সাত একরের কৃষি সাম্রাজ্য গড়েছেন ফারুক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১:১৪ পিএম, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১২:০৮ এএম ২০২৬
এক কমলাগাছ থেকে সাড়ে সাত একরের কৃষি সাম্রাজ্য গড়েছেন ফারুক
ছবি

ছবি সংগৃহীত

একটি কমলাগাছের ডাল থেকে তৈরি করেছিলেন শতাধিক চারা। সেই চারা দিয়ে শুরু করেন বাণিজ্যিক চাষ। প্রথম বছরই প্রায় ৫০ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করে পান সাফল্যের দেখা। এরপর কমলার পাশাপাশি আঙুর, মাল্টা, আম, ড্রাগনসহ নানা জাতের ফল চাষে যুক্ত হন। গড়ে তোলেন নিজস্ব নার্সারিও। এভাবেই শখের বশে লাগানো একটি কমলাগাছ থেকে কুড়িগ্রামে সাড়ে সাত একর জমিতে কৃষি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন আবু রায়হান ফারুক।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের বাসিন্দা ফারুকের সমন্বিত কৃষি খামারের নাম ‘কাজী এগ্রো ফুড রিসোর্ট অ্যান্ড ইকোপার্ক’। এখানে ফল উৎপাদনের পাশাপাশি উন্নত জাতের ফলের চারা তৈরি ও বিক্রি করা হয়। তাঁর উৎপাদিত চারা কিনতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চাষি ও নার্সারির মালিকেরা আসেন। এমনকি এসব চারা যাচ্ছে ভারতেও।

উদ্ভিদবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকে আত্মকর্মসংস্থানের পথ হিসেবে বেছে নেন ফারুক। তাঁর বাবা কাজী মো. হাবিবুর রহমান। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে পড়াশোনা করা এই উদ্যোক্তা এখন ফল ও চারা বিক্রি করে সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয় করছেন।

একটি কমলাগাছ থেকেই শুরু

২০১৮ সালে বগুড়ায় বেড়াতে গিয়ে একটি কমলার চারা কিনে আনেন ফারুক। বাড়ির উঠানে লাগানো সেই গাছে পরের বছর ফল ধরে। পরিবারের সদস্যরা কমলার স্বাদ ও মিষ্টতায় মুগ্ধ হন। এরপর গাছটির ডাল কলম করে শতাধিক চারা তৈরি করেন তিনি। এসব চারা এক বিঘা জমিতে লাগিয়ে শুরু করেন বাণিজ্যিক চাষ।

২০১৯ সালে প্রথম ফলনেই প্রায় ৫০ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করেন ফারুক। সেই সাফল্য তাঁকে আরও বড় পরিসরে চাষাবাদে উৎসাহিত করে। বর্তমানে দুই বিঘা জমিতে তাঁর শতাধিক কমলাগাছ রয়েছে। এ বছর প্রায় তিন লাখ টাকার কমলা বিক্রির পাশাপাশি প্রায় তিন লাখ টাকার কমলার চারাও বিক্রি করেছেন তিনি।

ফারুক বলেন, “উদ্ভিদবিদ্যায় পড়ালেখা শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিতে আত্মকর্মসংস্থানের পথ বেছে নিয়েছি। মাশাল্লাহ, কৃষি আমাকে চাহিদার তুলনায় অধিক দিয়েছে।”

ছাদবাগান দেখে তিন বিঘায় আঙুর চাষ

কমলার পর আঙুর চাষে আগ্রহী হন ফারুক। জেলার সীমান্তবর্তী ফুলবাড়ী উপজেলার এক ব্যাংক কর্মকর্তার বাড়ির ছাদবাগানে রাশিয়ান বাইকুনুর জাতের আঙুর দেখে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।

২০২১ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আনা কয়েক জাতের প্রায় ২০০টি আঙুরের চারা দিয়ে এক বিঘা জমিতে বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেন তিনি। এক বছর পর গাছে ফল আসে। এরপর নিজেই কলম পদ্ধতিতে চারা তৈরি করে আরও দুই বিঘা জমিতে আঙুরের চাষ সম্প্রসারণ করেন।

ফারুকের দাবি, তাঁর আঙুরবাগান দেশের প্রথম বাণিজ্যিক আঙুরবাগান। এখানে বিভিন্ন জাতের আঙুর উৎপাদনের পাশাপাশি চারা তৈরি ও বিক্রি করা হয়। চাষ শুরুর পর এক বছরে প্রায় দুই লাখ টাকার আঙুর এবং সাত লাখ টাকার আঙুরের চারা বিক্রি করেন তিনি। এ বছর প্রায় তিন লাখ টাকার আঙুর ও ১০ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। জাত ও আকারভেদে এসব চারার দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।

একই খামারে নানা জাতের ফল

ফারুকের খামারে আলাদা আলাদা ফলের বাগানের পাশাপাশি একই জমিতে একাধিক ফসল চাষের ব্যবস্থাও রয়েছে। দুই বিঘা জমিতে আঙুর, দুই বিঘায় কমলা এবং দুই বিঘায় আমের বাগান করেছেন তিনি। এ ছাড়া একই জমিতে সুপারি, আম, মাল্টা, আপেল ও আঙুরের গাছ লাগিয়েছেন। আঙুরের মাচার নিচে চাষ করছেন আদা।

খামারে কাটিমন ও বারি-৪ জাতের প্রায় ৫০০টি আমগাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ টাকার আম বিক্রি করেন তিনি। পাশাপাশি রয়েছে প্রায় চার হাজার সুপারি গাছ। সুপারি ও সুপারির চারা বিক্রি করে বছরে প্রায় এক লাখ টাকা আয় হয় বলে জানান ফারুক।

বাগানের চারা যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায়

ফারুকের কৃষি উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁর নার্সারি। প্রায় দুই বিঘা জমিতে গড়ে তোলা এই নার্সারিতে বাগানের ভালো ফলনশীল গাছ থেকে ডাল সংগ্রহ করে কলম পদ্ধতিতে নতুন চারা তৈরি করা হয়। এসব চারা কিনতে কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নার্সারির মালিক ও চাষিরা তাঁর খামারে আসেন।

নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নের আরিফ নার্সারির স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূর থেকে ফারুকের খামারে এসেছিলেন কমলা ও মাল্টার ডাল সংগ্রহ করতে।

রফিকুল ইসলাম বলেন, “ফারুক ভাইয়ের কমলার আকার বড় এবং স্বাদও ভালো। তাই দূর থেকে এসে ডাল নিয়ে চারা তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। ভালো বাগানের চারা থেকে মানুষ ভালো ফলন পেলে নার্সারিরও সুনাম হয়।”

খামারে কর্মসংস্থান ছয়জনের

ফারুকের খামারে নিয়মিত কাজ করেন ছয়জন শ্রমিক। কাজের চাপ অনুযায়ী খণ্ডকালীন শ্রমিকও নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের একজন আবদুর রহিম, বয়স ৫৫ বছর। একসময় তিনি দৈনিক মজুরিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এখন এই খামারে মাসিক বেতনে কাজ করছেন।

আবদুর রহিম বলেন, “আগে কাজ না থাকলে খাবার নিয়ে চিন্তা হতো। এখন সেই ভয় নেই। মাসিক বেতন পাই, খাওয়া নিয়ে আর টেনশন করতে হয় না।”

কৃষি সম্প্রসারণে দেখছেন সম্ভাবনা

ফারুকের মতে, দেশে কমলার চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে বিদেশ থেকে ফল আমদানি করতে হয়। বাণিজ্যিকভাবে দেশে কমলা চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদেশে ফল রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. নাহিদা আফরীন বলেন, আবু রায়হান ফারুক কমলা ও মাল্টার বাগান শুরু করার সময় থেকেই কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত তাঁর বাগান পরিদর্শন করেন এবং গাছের পরিচর্যা ও চাষাবাদ বিষয়ে পরামর্শ দেন।

তিনি আরো বলেন, কুড়িগ্রামের মাটিতে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর ও কমলার চাষ হচ্ছে। ফারুক পরীক্ষামূলকভাবে বাগান করে সফলতা পেয়েছেন। কেউ এ ধরনের কৃষি খামার গড়ে তুলতে চাইলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।

এসি/আপ্র/১৮/১০/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ইউটিউব দেখে আনারকলি চাষ, ১০ লাখ টাকা আয়ের আশা
১৪ অক্টোবর ২০২৬

ইউটিউব দেখে আনারকলি চাষ, ১০ লাখ টাকা আয়ের আশা

সবজি চাষে বারবার লোকসানের মুখে পড়ে নতুন সম্ভাবনার খোঁজে ইউটিউবের সহায়তা নেন মেহেরপুরের তরুণ কৃষি উদ্...

মানববসতি ও নদীভাঙনে বছরে হারাচ্ছে ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি
১১ অক্টোবর ২০২৬

মানববসতি ও নদীভাঙনে বছরে হারাচ্ছে ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি

দেশে নগরায়ণ বৃদ্ধির সঙ্গে আবাসন, সড়ক, শিল্প ও অন্যান্য অবকাঠামোর চাহিদাও বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জলবা...

খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিতে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা
১১ অক্টোবর ২০২৬

খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিতে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি নিশ্চিতে সারা দেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরীর উদ্যোগ নিয়েছে সর...

ঔষধি গাছ চাষে কৃষকের আয় বৃদ্ধিসহ শক্তিশালী করবে অর্থনীতি
১১ অক্টোবর ২০২৬

ঔষধি গাছ চাষে কৃষকের আয় বৃদ্ধিসহ শক্তিশালী করবে অর্থনীতি

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো অনেকটাই কৃষিনির্ভর। গ্রামের মানুষের আয়, জীবিকা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই