গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

শনির চাঁদে পৃথিবীর অণুজীবের টিকে থাকার ইঙ্গিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৩২ পিএম, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩৬ এএম ২০২৬
শনির চাঁদে পৃথিবীর অণুজীবের টিকে থাকার ইঙ্গিত
ছবি

আড়াই শ বছরেরও বেশি সময় ধরে ৩০০ মাইল চওড়া বরফের গোলকের মতো এনসেলাডাস -ছবি নাসা

শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। বরফে ঢাকা এই উপগ্রহের পৃষ্ঠ থেকে পানির ফোয়ারা ও জলীয় বাষ্প উদ্গীরণের দৃশ্য শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধানে এনসেলাডাস সৌরজগতের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। এবার নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর গভীর সমুদ্রের কিছু অণুজীব এনসেলাডাসের মতো চরম প্রতিকূল কৃত্রিম পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে।

গবেষকদের এই পরীক্ষার ফল এনসেলাডাসে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ নয়। তবে সেখানে অন্তত কিছু নির্দিষ্ট ধরনের অণুজীবের টিকে থাকার উপযোগী পরিবেশ থাকতে পারে - এমন সম্ভাবনাকে আরো জোরালো করেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা উষ্ণ প্রস্রবণের আশপাশে বসবাসকারী এসব অণুজীব হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডকে মিথেনে রূপান্তর করে শক্তি উৎপাদন করে। গবেষকেরা এনসেলাডাসের ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত মহাসাগরের অনুরূপ একটি কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে সেখানে এসব অণুজীবের টিকে থাকার ক্ষমতা পরীক্ষা করেন।

মিউনিখের লুডভিগ-ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক উইলিয়াম ওরসি বলেন, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রাণের যে কোষীয় সংজ্ঞা জানা আছে, তার ভিত্তিতে পরীক্ষার ফল বলছে, এ ধরনের কোনো জীব বা এর কাছাকাছি কিছু যদি এনসেলাডাসে থেকে থাকে, তাহলে সেখানে তাদের বেঁচে থাকার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

সৌরজগতের গ্রহগুলোর মধ্যে শনির পরিচিত উপগ্রহের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গ্যাসীয় এই গ্রহকে ঘিরে পরিচিত উপগ্রহের সংখ্যা প্রায় ৩০০। অথচ আড়াই শ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ৩০০ মাইল চওড়া বরফে ঢাকা এনসেলাডাসকে বিজ্ঞানীরা খুব একটা বিশেষ কিছু মনে করেননি। রোবটিক মহাকাশযানের পর্যবেক্ষণে সেই ধারণা বদলে যায়।

২০০০-এর দশক থেকে নাসার ক্যাসিনি মহাকাশযান এবং পরবর্তীতে জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্রের পর্যবেক্ষণে এনসেলাডাসের পৃষ্ঠ থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প ও বরফের কণা ছিটকে বের হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে এর জমাট পৃষ্ঠের নিচে একটি বড় লবণাক্ত মহাসাগরের অস্তিত্বেরও প্রমাণ মেলে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, এনসেলাডাসের সমুদ্রতল হাইড্রোথার্মাল ভেন্টে পরিপূর্ণ। এসব উষ্ণ প্রস্রবণ আশপাশের পানিকে উষ্ণ রাখে এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার সুযোগ তৈরি করে। গত বছর ক্যাসিনি মহাকাশযান এমনই একটি বাষ্পীয় ফোয়ারার মধ্য দিয়ে উড়ে যায়। সংগৃহীত নমুনায় বিজ্ঞানীরা জৈব পদার্থের উপস্থিতির প্রমাণ পান।

এরপর এনসেলাডাসের সমুদ্রের ক্ষুদ্র সংস্করণ পরীক্ষাগারে তৈরির উদ্যোগ নেন অধ্যাপক ওরসি ও তাঁর সহকর্মীরা। পানি, লবণ, কার্বনেট ও গুঁড়ো পাথর মিশিয়ে তাঁরা শুধু মহাসাগরের চরম ক্ষারীয় পরিবেশই তৈরি করেননি, একই সঙ্গে পানি ও পাথুরে সমুদ্রতলের মধ্যে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়াও পুনর্র্নিমাণ করেন।

এসব বিক্রিয়া পর্যাপ্ত হাইড্রোজেন উৎপন্ন করতে সক্ষম ছিল। এনসেলাডাসের মহাসাগরেও একই ধরনের রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।

এ অবস্থায় গবেষকদের প্রশ্ন ছিল, মিথেনোজেন নামে পরিচিত পৃথিবীর অণুজীবগুলো হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডকে মিথেনে রূপান্তর করে বেঁচে থাকে - তারা কি এনসেলাডাসের মতো কৃত্রিম পরিবেশেও টিকে থাকতে পারবে?

অধ্যাপক ওরসি বলেন, এটি ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ একটি অনুমান।

উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা জাপান ও তাইওয়ানের মধ্যবর্তী ওকিনাওয়া খাদের গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট থেকে সংগৃহীত অণুজীবের ওপর পরীক্ষা চালান। হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট হলো সমুদ্রতলের এমন উষ্ণ প্রস্রবণ, যেখান থেকে খনিজসমৃদ্ধ গরম পানি বেরিয়ে আসে।

পরীক্ষায় দেখা যায়, পানির অম্ল-ক্ষারমাত্রা ১১-এ পৌঁছালেও অণুজীবগুলো কৃত্রিম এনসেলাডাস-সমুদ্রে বেড়ে উঠতে পারে। এটি এসব জীবের আগে জানা সহ্যক্ষমতার সীমার চেয়েও বেশি। পানিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব কম থাকায় অণুজীবগুলো নিজেদের বিপাকক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ।

ওপেন ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডেভিড রদারি বলেন, কৃত্রিম এনসেলাডাস সমুদ্রে মিথেন উৎপাদনকারী বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব অণুজীবের টিকে থাকা সম্ভব - গবেষণায় তা প্রমাণিত হওয়ায় এনসেলাডাসে অণুজীবের অস্তিত্ব ও টিকে থাকার সম্ভাবনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা দূর হলো।

তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এই পরীক্ষার ফলকে এনসেলাডাসে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। অধ্যাপক ওরসির মতে, সেখানে যদি কখনো প্রাণের বিকাশ ঘটেও থাকে, সেটি পৃথিবীর প্রাণের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। এমনকি মিথেন উৎপাদনকারী অণুজীব সেখানে জন্ম নিলেও তারা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে কি না, তা এখনো অজানা।

কারণ পরীক্ষাগুলো মাত্র কয়েক দিন স্থায়ী হয়েছিল। ওরসি প্রশ্ন রেখেছেন, এসব অণুজীব এক বছর টিকে থাকতে পারবে কি না, কিংবা ১০ লাখ বছর টিকে থাকতে পারবে কি না - তা এখনো জানা নেই।

একই সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, এনসেলাডাসের বাষ্পীয় ফোয়ারা থেকে বের হওয়া বরফের কণাগুলো কীভাবে জমাট বাঁধে ও ভেঙে গিয়ে সমুদ্রের বিভিন্ন উপাদানকে আলাদা করে ফেলতে পারে। সমুদ্রের ফোঁটায় যদি ভিনগ্রহের অণুজীবের কোনো অংশ থাকে, তবে তা বরফের কণার ক্ষুদ্র অংশে অপেক্ষাকৃত ঘন অবস্থায় পাওয়া যেতে পারে।

বার্লিনের ফ্রি ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক পোস্টবার্গ বলেন, প্রাণের সন্ধানের ক্ষেত্রে এটি চমৎকার খবর। কারণ বর্তমান প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সম্ভাব্য প্রাণের লক্ষণ তুলনামূলকভাবে সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

এসব গবেষণা এনসেলাডাসে নতুন অভিযান পরিচালনার আগ্রহও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্রস্তাবিত এলফোর অভিযানে শনিকে প্রদক্ষিণকারী একটি কক্ষপথযানের সঙ্গে একটি অবতরণযান পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অবতরণযানটি এনসেলাডাসের দক্ষিণ মেরুতে নেমে সেখানকার মহাসাগর থেকে উদ্গীরিত বাষ্পে প্রাণের জৈব-চিহ্ন অনুসন্ধান করবে।

তবে সেই অভিযানের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরো দীর্ঘ সময়। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪২ সালের দিকে অভিযানটি উৎক্ষেপণ করা হতে পারে এবং ২০৫০-এর দশকের আগে তা শনিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই।

এনসেলাডাসে প্রাণ আছে কি না, তার উত্তর এখনো অজানা। কিন্তু পৃথিবীর চরম পরিবেশে টিকে থাকা অণুজীবকে সেখানে অনুরূপ কৃত্রিম পরিবেশে বেঁচে থাকতে দেখা বিজ্ঞানীদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে - বরফের নিচে অন্ধকার এক মহাসাগরে সত্যিই কি কোনো অজানা জীবনের অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে?
সানা/ডিসি/আপ্র/২৯/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ইসরায়েলকে আর মার্কিন সামরিক সহায়তা নয়
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসরায়েলকে আর মার্কিন সামরিক সহায়তা নয়

ইসরায়েলের আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে আরব-প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোটকে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার পর দেশটিক...

ভারতের পথেই হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র, মন্তব্য জয়শঙ্করের
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতের পথেই হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র, মন্তব্য জয়শঙ্করের

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অনুসৃত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কূটনৈতিক পথেই হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছে...

ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানা বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে যোগের পরামর্শ
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানা বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে যোগের পরামর্শ

ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানা আদায়ে অভিনব পদ্ধতি বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। বকেয়া ট্...

ক্যালিফোর্নিয়ায় সরকারি ছুটির স্বীকৃতি পেল দুই ঈদ
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্যালিফোর্নিয়ায় সরকারি ছুটির স্বীকৃতি পেল দুই ঈদ

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সরকারি ছুটির তালিকায় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে মুসলমানদের...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আওয়ামী লীগের দোসরদের গ্রেফতারে পুরস্কারের ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দোসরদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে এ ধরনের ব্যক্তিদের গ্রেফতারে যারা ভূমিকা রাখবেন, তাদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬-এর পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মন্ত্রীর এই ঘোষণার পক্ষে না বিপক্ষে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে