আবু সাঈদ মো. নাজমুল হায়দার
ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল কোনো একটি ঘোষণা, কোনো নেতার বক্তব্য কিংবা কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নয়। বরং সম্মেলনে দৃশ্যমান হয়েছে যে বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে আর কোনো একক কেন্দ্র আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম নির্ধারণ করতে পারছে না। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট প্রতীয়মান যে বহুকেন্দ্রিকতা মানেই নতুন কোনো ঐক্যবদ্ধ বিশ্বব্যবস্থার জন্ম নয়। বরং আমরা সম্ভবত আরও বহুকেন্দ্রিক, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খন্ডিত একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করছি।
নয়াদিল্লি ঘোষণায় একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতার সমালোচনা করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সংস্কারের দাবি তুলেছে এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সদস্যদেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভূমিকা বৃদ্ধির বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবার সচেতনভাবেই বলেছেন, ব্রিকস ‘কারও বিরুদ্ধে নয়’; বরং গ্লোবাল সাউথকে শুধু নিয়ম মেনে চলা কোনো পক্ষ নয়, আন্তর্জাতিক নিয়ম তৈরির অংশীদার হতে হবে।
সম্মেলনের সবচেয়ে শিক্ষণীয় দিক ছিল পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের অবস্থান। ঘোষণায় সামগ্রিক সংঘাতের ক্ষেত্রে সরাসরি ‘অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি’র দাবি না তুলে পক্ষগুলোকে সর্বোচ্চ সংযম দেখাতে বলা হয়েছে। সংলাপ, কূটনীতি, বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোর সুরক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে গাজার ক্ষেত্রে ঘোষণাটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট—সেখানে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা, অবাধ মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানচ্যুতির বিরোধিতা করা হয়েছে। এই ভাষাগত পার্থক্য কোনো সীমাবদ্ধতা নয়; ব্রিকসের কাঠামোগত বাস্তবতা। ইরান এই সংঘাতের সরাসরি পক্ষ।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক হিসাব ভিন্ন। ভারত একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। চীন ও রাশিয়া আরও স্পষ্টভাবে পশ্চিমা আধিপত্য হ্রাসের কথা বলে। ফলে সংঘাতে একটি পক্ষকে দায়ী করে কঠোর যৌথ ঘোষণা তৈরি করা প্রায় অনিবার্যভাবেই বিভক্তি সৃষ্টি করত। মে মাসে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরান যুদ্ধ নিয়ে যৌথ বিবৃতিতে পৌঁছাতে পারেননি- এই প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লিতে অন্তত একটি সর্বসম্মত ঘোষণা গ্রহণ করতে পারাই ভারতের জন্য কূটনৈতিক সাফল্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে এটিকে পড়ষষবপঃরাব-ধপঃরড়হ ঢ়ৎড়নষবস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।
একটি জোট যত বেশি বৈচিত্র্যময় হয়, তার প্রতিনিধিত্ব তত বাড়ে; কিন্তু একই সঙ্গে অভিন্ন সিদ্ধান্তের ব্যয়ও বাড়ে। চলতি বছরের ঐঁসধহরঃরবং ধহফ ঝড়পরধষ ঝপরবহপবং ঈড়সসঁহরপধঃরড়হং-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায়ও বলা হয়েছে, ব্রিকসের সম্প্রসারণ তার প্রতিনিধিত্ব বাড়ালেও একই সঙ্গে যবঃবৎড়মবহবরঃু ও পড়ড়ৎফরহধঃরড়হ পড়ংঃ বৃদ্ধি করেছে। তাই গবেষকরা ব্রিকসকে একটি সুসংহত ঢ়ড়ংঃ-ডবংঃবৎহ ড়ৎফবৎ নয়, বরং বর্তমান বিশ্বশাসন ব্যবস্থার ভেতরে একটি রহঃবৎহধষষু পড়হঃবংঃবফ পড়ৎৎবপঃরাব ঢ়ষধঃভড়ৎস হিসেবে দেখেছেন।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকসের এখনো শক্তিশালী স্থায়ী সচিবালয়, বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কাঠামো কিংবা সংঘাত ব্যবস্থাপনার নির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। ফলে রাজনৈতিক ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব নীতি-সমন্বয়ের মধ্যে একটি গ্যাপ থেকে যায়। এই দুর্বলতা একদিকে ব্রিকসকে নমনীয় রাখে—কারণ সদস্যরা নিজেদের সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে পারে। অন্যদিকে সংকটের সময়ে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা সীমিত করে। অর্থাৎ ব্রিকসের ভবিষ্যৎ শুধু সদস্যসংখ্যা বা অর্থনৈতিক ওজন বাড়ানোর ওপর নির্ভর করবে না; বরং এটি কতটা কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। এ কারণেই ব্রিকসকে ‘পশ্চিমবিরোধী সামরিক-রাজনৈতিক জোট’ হিসেবে দেখা ভুল।
ন্যাটোর মতো এর যৌথ প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা নেই, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অতিরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নেই এবং সদস্যদেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতিও অভিন্ন নয়। ভারতের ংঃৎধঃবমরপ ধঁঃড়হড়সু, চীনের বৃহৎ শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, রাশিয়ার পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার প্রয়োজন এবং ইরানের আর্থিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর প্রচেষ্টা- সবই একই প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত, কিন্তু লক্ষ্য এক নয়। এই বাস্তবতায় তথাকথিত ইজওঈঝ পঁৎৎবহপু নিয়ে অতিরঞ্জিত আলোচনা মূল বিষয়টিকে আড়াল করে।
ব্রিকসের জন্য নিকট ভবিষ্যতে একটি ইউরোর মতো অভিন্ন মুদ্রা তৈরি করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, পেমেন্ট সিস্টেমের আন্তঃসংযোগ এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক অর্থায়ন। ভারতীয় টচও, ব্রাজিলের চরী এবং অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর মধ্যে সংযোগ তৈরির আলোচনায় স্পষ্ট যে ডি-ডলারাইজেশন বলতে এখনই ডলার ‘পরাজিত’ করা নয়; বরং ডলারের ওপর অতিনির্ভরতার বিকল্প তৈরি করা। এখানেই বিশ্বব্যবস্থার বড় পরিবর্তনটি দৃশ্যমান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো শক্তিশালী; ডলারও বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রেই রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ আর একটি মাত্র আর্থিক, রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। তারা বিকল্প তৈরি করছে। ভবিষ্যৎ বিশ্ব তাই হয়তো দুটি কঠোর শিবিরে বিভক্ত হবে না। বরং কোনো একটি দেশ প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র, অবকাঠামোয় চীন, জ্বালানিতে রাশিয়া বা উপসাগরীয় দেশ, বাণিজ্যে ভারত এবং উন্নয়ন অর্থায়নে বিভিন্ন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করবে। এটিই হতে পারে ভষবীরনষব ধষরমহসবহঃ-এর যুগ।
এই পরিবর্তন গ্লোবাল সাউথের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করছে। সুযোগটি হলো- ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলো এখন একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ পাচ্ছে এবং উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে বিকল্প উৎস তৈরি করতে পারছে। ঝুঁকিটি হলো- প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে এসব রাষ্ট্র নতুন ধরনের চাপ, ঋণনির্ভরতা বা কৌশলগত মেরুকরণের মুখে পড়তে পারে। তাই বহুমেরু বিশ্বে কেবল বিকল্প থাকা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নীতিগত সক্ষমতা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং জাতীয় স্বার্থের স্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকসকে কেবল বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দৃষ্টিতে দেখলে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ উপেক্ষিত হতে পারে। বাংলাদেশ ২০২১ সাল থেকেই ব্রিকস প্রতিষ্ঠিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য। ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ব্যাংকটির তিনটি প্রকল্পে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদিত হয়েছে। তাই বাংলাদেশের প্রশ্ন হওয়া উচিত- ‘পশ্চিম, নাকি ব্রিকস’ নয়; বরং কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে উন্নয়ন অর্থায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি, বাজার প্রবেশাধিকার ও অবকাঠামোগত সুবিধা সবচেয়ে কার্যকরভাবে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের মতো মধ্যম শক্তির জন্য সঁষঃর-ধষরমহসবহঃ কোনো আদর্শিক দ্বিধা নয়; বাস্তববাদী রাষ্ট্রনীতি। তবে এই সঁষঃর-ধষরমহসবহঃ কার্যকর করতে হলে বাংলাদেশেরও আরো সুস্পষ্ট কৌশল প্রয়োজন। কেবল কোনো জোটে যোগ দেওয়া বা সম্মেলনে উপস্থিত থাকাই কূটনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। বরং দেখতে হবে, কোন প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ থেকে বিনিয়োগ, বাণিজ্য সুবিধা, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অবকাঠামো সহযোগিতায় বাস্তব ফল পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রতীকী কূটনীতির পরিবর্তে ফলাফলভিত্তিক অর্থনৈতিক কূটনীতি বাংলাদেশের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত ব্রিকসের সাফল্য নির্ভর করবে এটি কতটা পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে তার ওপর নয়; বরং তার বিশাল জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে বাস্তব জনকল্যাণমূলক সহযোগিতায় রূপ দিতে পারে কি না তার ওপর। যুদ্ধের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা, মানবিক সহায়তার সমন্বয়, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারে যদি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তবে ব্রিকস বিশ্বশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের শিক্ষা তাই দ্বিমুখী। ব্রিকসের উত্থান প্রমাণ করে যে পশ্চিমকেন্দ্রিক একমেরু বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই অতীত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটি কেন্দ্র দুর্বল হলেই আরেকটি কেন্দ্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার জায়গা নেয় না। ব্রিকস এখন সেই মধ্যবর্তী বিশ্বের প্রতীক- যেখানে শক্তি ছড়িয়ে পড়ছে, রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ছে, কিন্তু ঐকমত্য আরও কঠিন হচ্ছে। ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ তাই শুধু একটি বহুমেরু বিশ্ব তৈরি করা নয়; বরং সেই বহুমেরু বিশ্বকে সহযোগিতামূলক, নিয়মভিত্তিক এবং পরিচালনাযোগ্য করে তোলা।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬