গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

বিশ্ব পর্যটন দিবসে ফিরে দেখা শ্রেণিকক্ষের সেই মুহূর্তগুলো

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:২৮ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২১:৫২ এএম ২০২৬
বিশ্ব পর্যটন দিবসে ফিরে দেখা শ্রেণিকক্ষের সেই মুহূর্তগুলো
ছবি

ছবি সংগৃহীত

মো. মামুন হাসান

প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর যখন বিশ্ব পর্যটন দিবস আসে, তখন আমার মন ফিরে যায় শ্রেণিকক্ষের ওই মুহূর্তগুলোয়- যে সময় প্রথমবার একজন শিক্ষার্থীর চোখে পর্যটন শিল্পের প্রতি আগ্রহের ঝিলিক দেখেছিলাম। একজন শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পাঠদান করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, এ বিষয়টি কেবল একটি পেশাগত দক্ষতা শেখানোর বিষয় নয়; একজন তরুণকে দেশের প্রতি নতুন দৃষ্টিতে ভালোবাসতে শেখানোর একটি মাধ্যম।

আমার শিক্ষার্থীদের প্রথম পাঠ শুরু হয় একটি সহজ প্রশ্ন দিয়ে, তোমরা কি জানো তোমাদের নিজের জেলার কোথায় কোথায় ঘুরে দেখার মতো জায়গা আছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, অনেক শিক্ষার্থীই নিজের এলাকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে। এই অজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, পর্যটন শিক্ষার প্রথম কাজ হলো নিজের দেশ ও নিজের অঞ্চলকে নতুনভাবে চেনানো। বাংলাদেশে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০টি দর্শনীয় স্থান রয়েছে বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে আসে, কিন্তু এই সম্পদের প্রকৃত মূল্য বোঝার জন্য প্রয়োজন সচেতন ও দক্ষ মানুষ। আর সেই মানুষ তৈরির কাজটিই একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি আমি প্রায়ই শিক্ষার্থীদের বলি, পর্যটন শিল্প শুধু হোটেল বুকিং বা ট্যুর গাইড হওয়ার বিষয় নয়। এটি অর্থনীতি, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও প্রযুক্তির এক অপূর্ব মিলনস্থল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ৩ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে ৭৬ হাজার ৯০ কোটি টাকার বেশি। সরকার এই অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। যখন আমি এই পরিসংখ্যান শ্রেণিকক্ষে তুলে ধরি, শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে তাদের অর্জিত জ্ঞান কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। একটি সংখ্যা যখন একজন শিক্ষার্থীর কাছে নিজের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা হয়ে দেখা দেয়, তখন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হয়।

একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সব সময় বিশ্বাস করি, তত্ত্ব ও ব্যবহারিক শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে পর্যটন শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমাদের বিভাগে শিক্ষার্থীদের কেবল বই পড়িয়ে ক্ষান্ত হওয়া হয় না, বরং তাদের নিয়ে স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্র পরিদর্শনে যাওয়া হয়, হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র দেখানো হয়, এবং অতিথি সেবার মূল্যবোধ শেখানো হয়। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, যা কেবল পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়, বরং কর্মক্ষেত্রে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য অপরিহার্য।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির প্রভাব পর্যটন শিল্পেও ব্যাপকভাবে পড়েছে এবং এই বছরের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য ডিজিটাল এজেন্ডা অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স টু রিডিজাইন টুরিজম এ বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব শুধু ঐতিহ্যবাহী পাঠ্যক্রম শেখানো নয়, বরং শিক্ষার্থীদের এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করা। যখন আমি তাদের শেখাই কীভাবে ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা বিশ্লেষণ বা অনলাইন গ্রাহক সেবার মাধ্যমে একজন পর্যটক আকর্ষণ করা যায়- তখন অনুভব করি, আমার শ্রেণিকক্ষ কেবল একটি ঘর নয়, ভবিষ্যতের পর্যটন শিল্পের একটি পরীক্ষাগার।

শিক্ষকতার এই বছরগুলোতে সবচেয়ে আনন্দের অভিজ্ঞতা হলো, যখন কোনো প্রাক্তন শিক্ষার্থী কোনো হোটেল বা ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানে সফলভাবে কাজ করার খবর জানায়। তাদের সাফল্যের গল্প শুনে আমি বুঝি, একজন শিক্ষকের কাজ কেবল পাঠ্যক্রম শেষ করা নয়, বরং একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ দেখানো। আমাদের দেশের অসংখ্য তরুণ যদি পর্যটন শিল্পে সঠিক প্রশিক্ষণ পায়, তবে তারা কেবল নিজের কর্মসংস্থানের সমাধান করবে না, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এই যাত্রায় অনেক বাধাও আছে।

কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় আধুনিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগের ঘাটতি এবং সমাজে কারিগরি শিক্ষার প্রতি এখনও থাকা এক প্রকার দ্বিধা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, এই দ্বিধা দূর করতে হলে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সমাজের কাছে পর্যটন শিক্ষার মর্যাদা ও সম্ভাবনা তুলে ধরা প্রয়োজন। যখন একজন অভিভাবক বুঝবেন তার সন্তান পর্যটন শিক্ষা নিয়ে একটি সম্মানজনক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ক্যারিয়ার গড়তে পারবে, তখনই এই খাতে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।

বিশ্ব পর্যটন দিবস আমাকে প্রতিবার নতুন করে ভাবতে শেখায়, শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার নিরব সাধনা। আমার প্রতিটি শিক্ষার্থী যখন শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে বাস্তব জগতে পর্যটন শিল্পের একজন দক্ষ কর্মী বা উদ্যোক্তা হয়ে ওঠে, তখন আমি অনুভব করি আমার শিক্ষকতার জীবন সার্থক হয়েছে। আসুন, আমরা সবাই মিলে পর্যটন শিক্ষাকে আরও সমৃদ্ধ করি, যাতে আমাদের তরুণ প্রজন্ম দেশের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের সামনে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরতে পারে, এবং সেই সঙ্গে গড়ে তুলতে পারে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ পর্যটন অর্থনীতি।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

সংগীতসহ অভিনয়শিল্পীদের পাওনা বকেয়া ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংগীতসহ অভিনয়শিল্পীদের পাওনা বকেয়া ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম

খান মুহঃ আশরাফুল আলমসংগীত, নাটক, সিনেমা কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম- যে মাধ্যমেই হোক না কেন, একটি দৃশ্য...

পরীক্ষাভিত্তিক রোল নম্বর কি শিশুদের শেখাকে আনন্দদায়ক করে?
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরীক্ষাভিত্তিক রোল নম্বর কি শিশুদের শেখাকে আনন্দদায়ক করে?

ড. রউফুল আলমপ্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো, শিশুদের শেখার আনন্দ ধরিয়ে দেওয়া, নিজেদ...

জবাবদিহি ও জনকল্যাণে সরকারের নতুন রাষ্ট্রচিন্তা
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জবাবদিহি ও জনকল্যাণে সরকারের নতুন রাষ্ট্রচিন্তা

আহসান হাবিব বরুনরাষ্ট্র পরিচালনার চিরাচরিত ধারায় যখন কর্তৃত্ববাদ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শেকল ভেঙে স...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই