আহসান হাবিব বরুন
রাষ্ট্র পরিচালনার চিরাচরিত ধারায় যখন কর্তৃত্ববাদ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শেকল ভেঙে সেবাবোধ ও প্রজাহিতৈষী মনস্তত্ত্ব প্রাধান্য পায়, তখনই জন্ম নেয় এক নতুন রাষ্ট্রচিন্তা। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ঠিক তেমনই এক নতুন ভোরের সূর্যোদয় আমরা প্রত্যক্ষ করছি। দীর্ঘকালের প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা, আর্থিক বিশৃঙ্খলা ও সুশাসনের ঘাটতি কাটিয়ে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এক যুগান্তকারী ও ইতিবাচক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিনের সারগর্ভ বক্তব্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বর্তমান সরকারের গত সাত মাসের ইতিবাচক অগ্রযাত্রা কেবল সাময়িক কোনো অর্জনের সংকলন নয়; এটি একটি মেধাভিত্তিক, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর, প্রগতিশীল ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সুদৃঢ় ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অঙ্গীকারের উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ।
একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের প্রথম শর্তই হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বস্তি। বিগত ষোলো বছরের অপশাসন, দুর্নীতির করাল গ্রাস এবং ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন এই সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ও বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলস্বরূপ দেশের অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ‘মুডিজ’ বাংলাদেশকে ‘নেতিবাচক’ সূচক থেকে ‘স্থিতিশীল’ অবস্থানে উন্নীত করেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক বিশাল স্বীকৃতি। এর প্রত্যক্ষ সুফল হিসেবে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের দুয়ার প্রসারিত হচ্ছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য গতিশীল হচ্ছে এবং বিপুল কর্মসংস্থানের নবদিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা- নিত্যপণ্যের বাজারমূল্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য প্রমাণ করে যে, সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ ও কঠোর তদারকির ফলে খাদ্যপণ্যের দাম কমে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি ফিরে এসেছে। অসাধু মজুতদার, মুনাফালোভী চক্রান্তকারী ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো-টলারেন্স নীতি প্রান্তিক পরিবারগুলোর মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
অর্থনৈতিক স্বস্তির পাশাপাশি একটি দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার অন্যতম মৌলিক নিয়ামক হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা। দীর্ঘদিনের জমাকৃত জ্বালানি সংকট নিরসনে বর্তমান সরকার কোনো ক্ষণস্থায়ী সস্তা পথ না বেছে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা ভবিষ্যতে দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে অভাবনীয় সুরক্ষাবলয় দেবে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১৮ কার্গো এলএনজি আমদানি এবং চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণের জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা সরকারের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও কৌশলগত বড় সাফল্য। বিশ্ববাজারের উত্তাল পরিস্থিতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের মূল্য বহুলাংশে সহনীয় পর্যায়ে রাখা হয়েছে। জনগণের ওপর সামান্যতম আর্থিক চাপও যেন না পড়ে, সে জন্য সরকার খাতটিতে সর্বোচ্চ ভর্তুকি অব্যাহত রেখেছে। তদুপরি, গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধানে মধ্যমেয়াদে সারা দেশে ১৫০টি নতুন কূপ খনন কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় ধাপে আরও ১৫০টি কূপ খননের বিশাল রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। বিদ্যমান এলএনজি সক্ষমতা বহু গুণ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের আগেই তৃতীয় এফএসআরইউ চালুর ত্বরান্বিত উদ্যোগ এবং ভোলার চরফ্যাশনে ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও একটি বৃহৎ সার কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত দেশের কৃষি ও শিল্প বিপ্লবকে বহু দূর এগিয়ে নেবে।
একটি প্রগতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের মূল চালিকাশক্তি হলো তার তরুণ সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা। বর্তমান সরকার তরুণদের কেবল আশার বাণী শোনায়নি, বরং তাদের রাষ্ট্র গঠনের মূল কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে কার্যকর অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে ৫০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে- যার আওতায় ‘উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতি বছর পাঁচ হাজার মেধাবী তরুণকে স্বপ্ন পূরণের প্রারম্ভিক মূলধন দেওয়া হচ্ছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট ও প্রযুক্তিভিত্তিক সমাজে উন্নীত হতে প্রান্তিক পর্যায়ে সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন পৌঁছানোর উদ্যোগ এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়ে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে তরুণদের মেধার বিকাশ ঘটাতে সৌদি সরকারি শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার অংশ হিসেবে কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে দুপুরে সুষম খাবারের মতো সংবেদনশীল এবং যুগান্তকারী রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে- যা এর আগে কোনো সরকার ভাবেনি।
সামাজিক সুরক্ষা, সর্বজনীন কল্যাণ এবং কর্মজীবী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার সুরক্ষায় বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি অনন্য ও দৃষ্টান্তমূলক। সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও আর্থিক স্বস্তি পূরণে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ‘জাতীয় পে স্কেল ২০২৬’- যেখানে সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা পর্যন্ত স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে করে প্রশাসনিক স্তরে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ কর্মীদের নিট পেনশন বৃদ্ধি এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কল্যাণ ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা সমাজকে আরও সহানুভূতিশীল করে তুলবে। মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে মসৃণ ও নিরাপদ করতে ‘সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট’-এর অনুদান বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকার স্থায়ী তহবিলে রূপান্তর করা হয়েছে। গ্রামের প্রান্তিক কৃষক, মেহনতি মানুষ ও দুস্থদের সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড প্রবর্তন এবং ধর্মীয় সেবক ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানী ভাতার আওতা বাড়িয়ে সমাজ কাঠামোর প্রতিটি স্তরকে সম্মানিত করা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক জীবনের গুণগত মান উন্নয়নে সরকার গ্রহণ করেছে বৈপ্লবিক কিছু অবকাঠামোগত পরিবর্তন। তৃণমূল পর্যায়ের রোগীরা যেন সহজেই মানসম্মত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা পান, সে লক্ষ্যে সারা দেশে ডায়ালাইসিস সেবা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ১৫ তলা বিশিষ্ট আধুনিক জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুর্গম কিংবা দূরদূরান্তের মহাসড়কে আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে এবং রোগীদের অতি দ্রুত তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে প্রতি ১০ কিলোমিটার পরপর একটি করে উন্নত ‘লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স’ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক অনন্য মাইলফলক। অপরপক্ষে, রাজধানীর যানজট নিরসন ও যাতায়াত ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে ক্যাশলেস স্বয়ংক্রিয় টোল ব্যবস্থা, বাস টার্মিনাল স্থানান্তর এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত তদারকি চালিয়ে পরিবহন খাতে অভাবনীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যের জায়গা হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিলোপ সাধন এবং শাসনব্যবস্থাকে আমলাতান্ত্রিক ঔদ্ধত্য থেকে মুক্ত করে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তস্নাত আত্মত্যাগের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানিয়ে গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা, অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত ও শহীদ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মাধ্যমে আইনের শাসনের বড় নজির স্থাপিত হয়েছে। প্রশাসনকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি আনতে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে সরকারি নথিপত্রে ‘মহামান্য’ বা ‘মাননীয়’ সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়েছে- যা নির্দেশ করে সরকারের নীতি হলো শাসন নয়, সেবা। এর পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনকে ভয়ভীতির স্থান না বানিয়ে জনবান্ধব ও সেবামুখী করতে দেশের ৬৪ জেলা সদরের থানাকে ‘জিরো কমপ্লেইন্ট’ সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নেপালে জরুরি মানবিক সহায়তা প্রেরণের মতো ইতিবাচক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
যে কোনো সৎ ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথেই কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল ও চক্রান্তকারীদের অপচেষ্টা থাকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে এবং গঠনমূলক সমালোচনাকে ইতিবাচক রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান অনুষঙ্গ মনে করে। অপপ্রচার ও কৃত্রিম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে সরকারের শুভ উদ্যোগগুলোকে ম্লান করার অপচেষ্টা সত্ত্বেও সরকার তার উন্নয়নমুখী লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- এই চিরন্তন চেতনা ও মূলমন্ত্রকে ধারণ করে, দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও আত্মনিবেদনে একটি আত্মনির্ভরশীল, সার্বভৌম, নিরাপদ ও মানবিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে শুভযাত্রা শুরু হয়েছে, তা অদম্য গতিতে এগিয়ে যাবে- এটিই দেশবাসীর দৃঢ় প্রত্যাশা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬