ড. রউফুল আলম
প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো, শিশুদের শেখার আনন্দ ধরিয়ে দেওয়া, নিজেদের মতো করে ভাবতে শেখা, দলগতভাবে শেখার আনন্দ উপভোগ করতে দেওয়া, টিম ওয়ার্ক শেখানো, মানবিক ও সহনশীল হতে শেখানো। শিশু যদি পাঠে আনন্দ না পায়, শিখতে আনন্দ না পায়; তাহলে পড়াশোনার প্রতি ধীরে ধীরে তার ভেতরে অনীহা জাগতে শুরু করে। শিশুরাও খুব অল্প বয়স থেকেই সেই অনীহা লুকিয়ে রাখতে শিখে যায়, যখন সে দেখে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সেই অনীহা প্রকাশকে খারাপভাবে দেখা হয়।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা খুবই মানসিক চাপের। তাদের শৈশব থেকেই চাপ দেওয়া হয়। ক্লাসের রোল নম্বর প্রথম দিকে থাকতে হবে। পাঠের আনন্দ দেওয়া, সৃষ্টিশীলতা জাগিয়ে তোলা আর রোল নম্বর এক হওয়া- এই বিষয়গুলো কিন্তু আলাদা। শিশু যখন বুঝতে পারে, সে বেশি নম্বর পেলে, রোল নম্বরের তালিকায় প্রথম দিকে থাকলে, পরিবার খুশি হয়, স্কুলের শিক্ষকদের আলাদা এটেনশন পাওয়া যায়, তখন তার লক্ষ্য আর পাঠের আনন্দ থাকে না। সে খুব সহজেই মুখস্থ করতে শুরু করে। শিশুদের মুখস্থ করার ক্ষমতা থাকে অসাধারণ।
শিশুরা যখন মুখস্থনির্ভর শিক্ষা গ্রহণ করে, তখন তাদের সৃষ্টিশীলতা কমে। তাদের ভাবনার শক্তি কমে। এটা গবেষণালব্ধ কথা। শিশুদের ভাবনার শক্তি বা প্রখরতা কমলে সে কৈশোর-যৌবনে ক্রিটিক্যাল থিংকিং, উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি ইত্যাদিতে আগ্রহ হারাতে পারে। গবেষণা করে এটাও দেখা যায় যে, শিশু নিজেকে কেমন ভাবে, সেটা তার প্রকৃত দক্ষতার চেয়ে বেশি নির্ভর করে ক্লাসে তার আপেক্ষিক অবস্থানের ওপর। সেলফ ডিটারমিনেশন বা আত্মপ্রত্যয় থিউরিতে দেখানো হয়েছে, পারিপার্শ্বিকতা থেকে চাপানো পুরস্কার (যেমন রোল নম্বর ভালো করা বা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা) আর অন্যের সাথে তুলনা ইত্যাদি শেখার ভেতরের আগ্রহকে ক্ষয় করে দেয়।
পৃথিবীর বহু দেশের স্কুলে এই ধরনের ক্রমতালিকা বা রোল নম্বর নেই। রোল নম্বর থাকা যে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর, সেটি দুনিয়ার বহু গবেষক অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাদের সেই গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে অনেক দেশ এই পদ্ধতি বাদ দিয়েছে। উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর জাতীয় পাঠ্যক্রমে স্পষ্ট করে লেখা আছে, নিচের শ্রেণিতে মূল্যায়নের কাজ শিশুকে সাহায্য করা- শিশুদের পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করে সাজিয়ে দেওয়া নয়। ফিনল্যান্ডে স্কুল বা শিক্ষকেরও র্যাঙ্কিং (ক্রম তালিকা) প্রকাশ করা হয় না। কারণ নীতিগতভাবেই ধরে নেওয়া হয় যে মূল্যায়নের ফল দিয়ে কাউকে চিহ্নিত করে দেওয়া উচিত না।
রোল নম্বরের বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি: বোর্ড বা জেলা থেকে প্রতিটা গ্রেডের (ক্লাসের) জন্য গাইডলাইন রাখা জরুরি। ন্যূনতম কতটুকু যোগ্যতা প্রতিটা শিশুর থাকা উচিত, সেটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তারপর প্রত্যেকের কাজের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষকরা মতামত বা মন্তব্য বা গ্রেডও করতে পারবেন। পাঠে যারা পিছিয়ে পড়ে তাদের টেনে তোলার জন্য শিক্ষকদের ফোকাস থাকে।
শিশুদের জন্য আলাদা স্কোরিং, গ্রেডিং, মন্তব্য করা হয়- যেটি শুধু অভিভাবক ও ওই শিশু জানবে বা দেখবে। একজন শিশু অন্য শিশুর স্কোর দেখতে পারছে না- যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা সেটি আলোচনা করছে কিংবা মোট স্কোরের ওপর ভিত্তি করে রোল নম্বর দেওয়া হচ্ছে না অথবা বার্ষিক পরীক্ষা বা সাময়িক পরীক্ষার মাধ্যমে রোল নম্বর দেওয়া হচ্ছে না। কেউ হয়তো লিটারেচারে বেশি নম্বর পেল। কিন্তু গণিতে কম পেল বা কেউ হয়তো আর্ট ও মিউজিকে বেশি পেল। অথচ সায়েন্সে কম পেল। সব স্কোর একসঙ্গে করে রোল নম্বর না দেওয়ায় প্রত্যেকে প্রত্যেকের সফলতাকে এপ্রিসিয়েট করতে পারছে।
বলে নিচ্ছি, মূল্যায়ন আর ক্রমতালিকা এক জিনিস নয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শিশুদের কাজের মূল্যায়ন হয়। নম্বর বা গ্রেডও দেওয়া হয়। আমি যে দুটো জিনিসকে পার্থক্য করছি, সেগুলো আলাদা। তা হলো- এক. সব বিষয়ের নম্বর যোগ করে প্রত্যেক শিশুকে একটা একক ক্রমে বসিয়ে দেওয়া এবং দুই. ওই ক্রমকে প্রকাশ্য করে দেওয়া, যাতে পুরো ক্লাস, পরিবার আর পাড়া-প্রতিবেশী জেনে যায় কে, কোথায় আছে। সমস্যাটা নম্বর দেওয়ায় নয়, নম্বরকে সিরিয়াল বানানোতে- আর ওই সিরিয়ালকে শিশুর পরিচয় বানিয়ে ফেলায়।
রোল নম্বরের আরো কিছু ক্ষতিকর দিক: শিশু তার শিক্ষা জীবন শুরু করার সময়ই বুঝে যায় যে, সে অন্যদের চেয়ে খুব ভালো। নয়তো খুব খারাপ। কারণ একটা রোল নম্বর প্রতিটা ক্লাসে এক বছরের জন্য একটা ট্যাগ! এটা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। কিন্তু জীবন এত সরলরৈখিক না। যার রোল নম্বর শৈশবে এক থাকবে, সে যে কৈশোর কিংবা যৌবনে খুব ভালো করবে এমন নিশ্চয়তাই নেই। যে নাচে ভালো, যে সংগীতে ভালো, যে আঁকায় কিংবা খেলায় ভালো–সে কি মেধাবী না? কিংবা যে খুব চটপটে এবং নিঃসঙ্কোচে কথা বলতে জানে–সে কি মেধাবী না? এগুলোও তো মেধা। আমরা যদি শুধুমাত্র পাঠভিত্তিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর একজন শিক্ষার্থীকে পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে গোটা বছর ধরে সেরা মনে করি, তাহলে যে নাচ, গান, খেলা, আবৃত্তি ও উপস্থাপনায় সেরা, তাকে কি মেধাবী বলবো না?
শিশুদের এই রোল নম্বরের সাথে সাথে অভিভাবকের মানসিক চাপ বাড়ে। অভিভাবকরা অস্থির হয়ে পড়েন। যেসব শিক্ষার্থী রোল নম্বরে পিছিয়ে, তারা গৃহশিক্ষক রাখেন। দ্বিতীয় শ্রেণির বাচ্চাদের পড়ানোর জন্যও বাসায় শিক্ষক এখন! কী আশ্চর্য! আপনি ছয়-সাত বছরের বাচ্চার কাছে শিক্ষা বিষয়টাকে বিষিয়ে তুলছেন! সে স্কুলে পড়ে। বাসায় পড়ে। পড়াশোনা তার কাছে অস্থির মনে হয়! এমন চাপে থেকে, কম্প্রিহেনসিভ রিডিং বা ব্যাপক পঠন বা বিস্তৃত পাঠ বা লেখালেখি ওরা করতে পারে না। ফলে এটেনশন স্প্যান বা মনোযোগের স্থায়িত্বকাল বা মনোযোগ ধরে রাখার সময়সীমা কমে যায়। বহু শিশুর কাছে পড়াশোনাটা বোঝা মনে হয়। তারা তীব্র ক্লান্তিতে ভোগে।
রোল নম্বর না থাকলে পারিপার্শ্বিক এই চাপের সংস্কৃতি অনেক কমে আসে। শিক্ষকরাও সাধারণত যাদের রোল নম্বর ভালো, তাদের প্রতি একপেশে আচরণ করেন। তাদের বেশি যত্ন বেশি নেন। রোল নম্বরের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যাদের রোল নম্বর কম তাদের অভিভাবকদের সাথে শিক্ষকদের যোগাযোগ বাড়ার প্রবণতা থাকে। মূল্যায়ন বিষয়টা থাকবে। কিন্তু শিশুদের জন্য মূল্যায়নটা হওয়া উচিত ভিন্ন প্রক্রিয়ায়। চাপটা হওয়া উচিত ধীরে ধীরে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের পরীক্ষার চাপ দেওয়া উচিত না কিংবা অনেকগুলো বিষয়ের পরীক্ষা একসাথে নেওয়ার সংস্কৃতি বদলানো উচিত। পরীক্ষা বিষয়টা যে কত ভয়াবহ মানসিক চাপের, সেটা বাংলাদেশে বড় না হলে কেউ বুঝবে না।
আমি যখন স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে গেলাম, তখনো দেখেছি, ওদের শিক্ষার্থীরা বাসায় গিয়ে তেমন পড়েই না। যা পড়ার, সেটা ইউনিভার্সিটিতেই শেষ। নাওয়া-খাওয়া ভুলে, দিন-রাত পড়াশোনার সংস্কৃতি আমি বিদেশে দেখিনি। এর কারণ হলো ওরা ভিন্ন সংস্কৃতিতে শৈশব থেকে বড় হয়েছে। এটা আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, কোনো জরিপ নয়, কিন্তু পর্যবেক্ষণটা আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। যেমন, ফিনল্যান্ডে, ১৪-১৫ বছর পর্যন্ত কোনো স্ট্যান্ডার্ড পরীক্ষাই নেই। ওরা ফোকাস করে বাচ্চারা শিখছে কিনা, ভাবছে কিনা। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বেশি জিপিএ পাওয়ার যে পারিবারিক ও সামাজিক চাপ–সেটা আমি ইউরোপেও দেখিনি। মাসব্যাপী পরীক্ষা নেই। অভিভাবকদের দিনভর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই।
উল্লেখ্য যে, ২০২১ সালে বাংলাদেশের অনুমোদিত জাতীয় শিক্ষাক্রমে প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো প্রথাগত পরীক্ষা রাখা হয়নি। যেটা ২০২৩ সাল থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। শুধুমাত্র পরীক্ষা নির্ভর মূল্যায়নের প্রচলিত ধারা থেকে বের হয়ে বছরব্যাপী মূল্যায়নের ওপর জোর দিয়েছিল। যদিও বিষয়টি নিয়ে সে সময় বিভিন্ন মহলে বেশ সমালোচনাও হয়েছে। তাছাড়া, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে এই প্রকল্পও বাতিল হয়ে যায়।
পৃথিবীর কোনো দেশেই এক ও অভিন্ন কোনো স্ট্যান্ডার্ড নিয়মে শিক্ষাব্যবস্থা চলে না। প্রতিটা দেশই তার জনসংখ্যা, সম্পদ, শিক্ষার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে সময়ে সময়ে সেই ব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনসংখ্যা একটা সমস্যা। পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক ও অবকাঠামোগত রিসোর্সের সীমাবদ্ধতাও আছে। এগুলো অবশ্যই আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে প্রথাগত নিয়ম পরিবর্তনেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শিক্ষাব্যবস্থার যে পরিবর্তন জাতি গঠনে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে, বিশ্বের সাথে আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে, যে পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। পুরো দেশে একযোগে কোনো কিছু পরিবর্তন ও প্রয়োগের পরিবর্তে পাইলট প্রজেক্ট আকারে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা উচিত। তারপর সেটা পুরো দেশে প্রয়োগ করা উচিত।
সবশেষে বলবো, পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষা ও রোল নম্বরের চাপে শিক্ষার অনেক মৌলিক উদ্দেশ্য বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সেগুলো কী করে পুনরুদ্ধার করা যায়, সেভাবেই পলিসির পরিবর্তন ও প্রয়োগ দরকার। এর সূচনা করতে হবে প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই। শিশুদের শিক্ষাকে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতামূলক না করে, আনন্দময় করার চেষ্টা করতে হবে। স্কুলের আনন্দ, শেখার আনন্দ যেন তাদের কাছে চাপিয়ে দেওয়া বা বোঝা মনে না হয়, সেজন্যই প্রচলিত ধারার পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো দেশেই এর পজেটিভ প্রভাব পড়বে।
লেখক: স্টাফ সাইন্টিস্ট, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো, যুক্তরাষ্ট্র
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬