সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থান দুটিতে ভাস্কর্য নির্মাণের পরিবর্তে পানির ফোয়ারা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৭ মার্চের ভাষণের ‘হলোগ্রাফিক থ্রিডি’ উপস্থাপনার বিষয়বস্তুতেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের গত ৬ আগস্টের অগ্রগতি প্রতিবেদনে প্রকল্পের পরিধি ও উদ্দেশ্যে পরিবর্তন আনার এ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ নামের প্রকল্পটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০১৮ সালে শুরু হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জুনে। এর তৃতীয় পর্যায়ের প্রথম সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৯৭ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ৭৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৯৪ শতাংশ।
প্রকল্পটির আওতায় ৭ মার্চের ভাষণ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানে দুটি ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। নির্মাণাধীন দুটি স্থানেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এরপর ২০২৫ সালের মার্চে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জানায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওই দুটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হবে না।
এখন ওই দুই স্থানে পানির ফোয়ারা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নথিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় থানা নির্মাণ এবং ৭ মার্চের ভাষণ ও ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণের পরিবর্তে ওয়াটার ফাউন্টেন স্থাপন করা হবে। এ জন্য নকশা পরিমার্জনের কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ৭ মার্চের ভাষণের ‘হলোগ্রাফিক থ্রিডি’ উপস্থাপনার বিষয়বস্তু পরিবর্তনের উদ্যোগের কথাও একই নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পানির ফোয়ারা নির্মাণের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করা অতিরিক্ত সচিব হাসনা জাহান খানমও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান মিয়ার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
শাহজাহান মিয়া এ বিষয়ে মন্তব্য না করে উপসচিব পলি করের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। মন্ত্রণালয়ের যে প্রতিবেদনে পানির ফোয়ারা নির্মাণের মতামত তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে পলি করের সই রয়েছে। যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকার কথা জানান। তবে নথিতে নিজের সই থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন।
প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকা প্রণব কুমার সাহার সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তার দাপ্তরিক কক্ষেও একাধিক দিন গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রণালয়ের লোকজনের চাপে পড়ে প্রকল্পের ভৌত কাজ এবং কিছু স্থাপনার নকশায় পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। বিষয়গুলো একনেকের সভায় উঠলে এরপর কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা দেখা যাবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, সব নকশা সহজে পরিবর্তন করা যায় না। এটি জাতীয় বিষয় হওয়ায় ইচ্ছা করলেই সবকিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
তার ভাষ্য, ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থান দুটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এসব স্থানের পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উত্তর-পশ্চিম কোণায় রয়েছে ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থান দুটি। ছবির হাটের ফটক দিয়ে প্রবেশ করে কয়েক কদম এগোলেই বাঁ পাশে স্থানটি দেখা যায়।
গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থানটি টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এর ভেতরে কিছু নির্মাণাধীন অবকাঠামো রয়েছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর থেকে উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরের অবস্থাও বেহাল। আগে দিনভর সেখানে মানুষের আসা-যাওয়া থাকলেও এখন নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া তেমন কাউকে দেখা যায় না।
সানা/আপ্র/২৬/৯/২০২৬