পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমিগুলোর একটি চিলির আতাকামা। সাধারণ সময়ে যেখানে দেখা যায় পাথুরে মাটি, বাদামি বালিয়াড়ি আর শুষ্কতার চিহ্ন, সেই মরুভূমিই এবার বদলে গেছে। বিশাল এলাকা ছেয়ে গেছে নানা রঙের বুনোফুলে। দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে, মরুভূমির ওপর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে রঙিন ফুলের চাদর।
দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্ত আসার সময় আতাকামায় মাঝেমধ্যে ফুল ফুটতে দেখা যায়। তবে এবারের দৃশ্য অনেক বেশি বিস্তৃত ও ব্যতিক্রমী। স্থানীয়ভাবে এই বিশেষ প্রাকৃতিক ঘটনাকে বলা হয় ‘দেসিয়ের্তো ফ্লোরিদো’, যার অর্থ ফুলেল মরুভূমি।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে এল নিনোর প্রভাবে আতাকামায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়। সেই বৃষ্টির পানি পৌঁছে যায় মরুভূমির মাটির গভীরে থাকা অসংখ্য বীজ ও কন্দে। দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা এসব বীজ ও উদ্ভিদাংশ পর্যাপ্ত পানি পেয়ে অঙ্কুরিত হয়ে ফুলে পরিণত হয়।
চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে চিলির কয়েকটি অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিও হয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে বৃষ্টিপাতের পরিমাপ শুরু হওয়ার পর কোনো কোনো এলাকায় এবারই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয়েছে।
কয়েক দশক পর ফুটেছে ফুল
আতাকামার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিভাগের জীববিজ্ঞানী সেসার পিসারোর মতে, কোনো কোনো এলাকায় ১৬০, ১৮০ এমনকি ১৯০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। এর পেছনে তীব্র এল নিনোর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই বৃষ্টিই মরুভূমির মাটিতে থাকা দীর্ঘদিনের সুপ্ত জৈব উপাদানকে সক্রিয় করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বীজ, কন্দ ও বিভিন্ন ধরনের ভূগর্ভস্থ উদ্ভিদাংশ। এমনকি বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও সরীসৃপের ডিমও এতে সক্রিয় হতে পারে।
ফলে আতাকামার কিছু পাহাড় ও পর্বতমালায় ৩০ থেকে ৪০ বছর বা তারও বেশি সময় পর সবুজ উদ্ভিদ ও ফুল দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো জৈব উপাদান বছরের পর বছর, এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।
দুই শতাধিক প্রজাতির ফুল
এবার আতাকামায় ২০০টিরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ ও ফুল দেখা যাচ্ছে। লাল ও হলুদ নানুকা, বেগুনি রক পার্সলেন, সাদা সুসপিরোস, কমলা টেরসিওপেলোসসহ বিভিন্ন রঙের ফুলে ঢেকে গেছে মরুভূমির পাহাড়, সমতলভূমি ও গিরিখাত।
মরুভূমির পরিচিত স্থানীয় উদ্ভিদ ‘গাররা দে লেওন’-এরও দেখা মিলছে। সব মিলিয়ে শুষ্ক ও বাদামি আতাকামা এখন পরিণত হয়েছে রঙিন ফুলের বিশাল প্রান্তরে।
১৯৯৭ সালের পর সবচেয়ে বড় ফুলেল মরুভূমি
চলতি বছর প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ফুলের বিস্তার ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পর এবারই সবচেয়ে তীব্র ও বিস্তৃত ‘দেসিয়ের্তো ফ্লোরিদো’ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ঘটনা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, মরুভূমির জীববৈচিত্র্যেরও এক বিরল চিত্র সামনে এনেছে। দীর্ঘ সময় সুপ্ত থাকা বীজ ও উদ্ভিদাংশ অনুকূল পরিবেশ পেয়ে সক্রিয় হওয়ায় আতাকামার প্রাণপ্রকৃতিতে এসেছে সাময়িক পরিবর্তন।
ফুল দেখতে বাড়ছে পর্যটক
বুনোফুলে ঢেকে যাওয়া আতাকামা দেখতে এখন চিলির বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিদেশ থেকেও পর্যটকেরা ছুটে আসছেন। দুর্গম ও প্রতিকূল এলাকাতেও মানুষ যাচ্ছে লাখ লাখ ফুলের এই অসাধারণ দৃশ্য দেখতে।
চিলির জাতীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক এই দৃশ্য নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আগে আতাকামা অঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ পর্যটকের আগমন হতে পারে। ফলে এবারের ‘দেসিয়ের্তো ফ্লোরিদো’ ইতোমধ্যে আতাকামার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
এসি/আপ্র/০৩/১০/২০২৬