শিমলা পাল
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম বড় উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। পাড়া-মহল্লার অলিগলি থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম পর্যন্ত এদের উৎপাত বিস্তৃত। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুন, ছিনতাই, ইভটিজিং কিংবা আধিপত্য বিস্তারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাদের হাতে বই-খাতা কিংবা খেলার সামগ্রী থাকার কথা ছিল, তারা কেন ধারালো অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামছে? এই অপরাধপ্রবণতা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে দমন করা সম্ভব নয়। কিশোর গ্যাং কালচার থেকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে সবার আগে দরকার শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন এবং হারিয়ে যাওয়া খেলার মাঠ উদ্ধার। এলাকাভিত্তিক খেলার মাঠে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে অন্তত কয়েকশ সক্রিয় কিশোর গ্যাং বা গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে- যার মধ্যে শুধু ঢাকাতেই শতাধিক গ্রুপ সক্রিয়। গ্যাংগুলোতে সদস্যসংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গ্যাং অপরাধে জড়ানো কিশোরদের একটি বড় অংশই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। তবে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও এতে পিছিয়ে নেই।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সামান্যতম অনুশোচনা ছাড়াই এসব কিশোর বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আমাদের দেশে ‘শিশু আইন ২০১৩’ বিদ্যমান- যেখানে ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে গণ্য করে তাদের বিচার ও সংশোধনের জন্য পৃথক শিশু আদালতের বিধান রাখা হয়েছে। আইনের মূল লক্ষ্য শিশুদের অপরাধী না বানিয়ে তাদের সংশোধন করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গ্রেপ্তার বা সংশোধনাগারে পাঠিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যাবে না। কারণ ব্যাধির মূল শিকড় রয়ে গেছে সামাজিক কাঠামোর ভেতরে। আজকের এই কৃত্রিম ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান দুটি কারণ হলো পারিবারিক সান্নিধ্যের অভাব এবং খেলার মাঠের বিলুপ্তি। পরিবার হলো একজন মানুষের নৈতিক শিক্ষার প্রথম বিদ্যাপীঠ।
বর্তমানে একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে একক পরিবার বৃদ্ধিতে শিশুদের ওপর নজরদারি ও মনোযোগ কমে গেছে। অনেক পরিবারে মা-বাবা উভয়েই কাজের ব্যস্ততায় সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। এই একা থাকার সুযোগে কিশোররা ইন্টারনেটের ক্ষতিকর দিক কিংবা পাড়ার বাজে আড্ডায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সন্তানের চালচলন, কার সঙ্গে মেলামেশা করছে বা রাতে কখন ঘরে ফিরছে- এ বিষয়গুলোয় মা-বাবার নজরদারি ও বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের অভাবই কিশোরদের গ্যাং কালচারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খেলার মাঠের তীব্র সংকট। আমাদের শহর ও মফস্বলগুলোয় ইট-কাঠের দালানের ভিড়ে খেলার মাঠ প্রায় হারিয়ে গেছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরাঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি শিশুর পর্যাপ্ত শারীরিক ব্যায়াম বা খেলাধুলার সুযোগ নেই। বিকাল হলে যেখানে কিশোরদের মাঠে মেতে থাকার কথা ছিল, সেখানে মাঠ না থাকায় তারা হয় স্মার্টফোনের পর্দায় ডুবে থাকছে, নয়তো গলির মোড়ে অলস আড্ডায় সময় কাটাচ্ছে। এই অলস সময় ও মোবাইল গেমিংয়ের নেশা থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে গ্যাং কালচার ও অপরাধী মানসিকতা। অথচ খেলাধুলা শুধু শারীরিক সুস্থতা দেয় না; নিয়মকানুন মানা, সামাজিকতা ও মনের ভেতরের ক্ষোভ বা অতিরিক্ত শক্তিকে ইতিবাচক কাজে লাগাতে শেখায়। কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে এখন সময় এসেছে সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ নেওয়ার। পরিবারকে সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ ও বিশ্বস্ত স্থান বানাতে হবে।
মা-বাবাকে হতে হবে সন্তানের সেরা বন্ধু- যেন যেকোনো বিভ্রান্তিতে পড়ে সন্তান ঘরের বাইরে না গিয়ে পরিবারের কাছেই আশ্রয় খোঁজে। এর পাশাপাশি প্রতিটি মহল্লায় হারিয়ে যাওয়া খেলার মাঠ উদ্ধার করা এবং সাংস্কৃতিক ক্লাবগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। পুলিশের অভিযান বা আইনের শাসন হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু এই ব্যাধি চিরতরে নির্মূল করার মূল চাবিকাঠি রয়ে গেছে ঘরে ও মাঠে। আমাদের সন্তানদের অন্ধকারের পথ থেকে আলোর পথে ফেরাতে ঘরে পারিবারিক ভালোবাসা আর বাইরে খেলার মাঠ ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬