গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

আইনের আড়ালে মব জাস্টিস: বদরগঞ্জের ঘটনা ও আমাদের সামাজিক বিভ্রান্তি

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:১৮ পিএম, ০২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২৩:০৩ এএম ২০২৬
আইনের আড়ালে মব জাস্টিস: বদরগঞ্জের ঘটনা ও আমাদের সামাজিক বিভ্রান্তি
ছবি

ছবি সংগৃহীত


মাহাবুব রহমান বিপ্লব

সম্প্রতি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার চাঁদকুঠির ডাঙ্গা এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় অপরাধের অভিযোগ নয়; এটি আমাদের বিচারব্যবস্থা, সামাজিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তথাকথিত ‘নৈতিক স্খলন’-এর অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক নারী ও এক যুবককে একই দড়িতে বেঁধে প্রকাশ্যে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। একই সঙ্গে ওই নারীর বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে এবং নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এখানে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছেন বলে অভিযোগ উঠলেই কি তাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার জনতার হাতে চলে যায়? উত্তর স্পষ্ট-না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার রাষ্ট্রের আইনগত প্রতিষ্ঠানগুলোর। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় এবং কেবল আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছে। ৩২ অনুচ্ছেদে আইনানুযায়ী ছাড়া জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কাউকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। আর ৩৫ অনুচ্ছেদের বিধান নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর আচরণ নিষিদ্ধ করেছে। তাই বদরগঞ্জের ঘটনায় কথিত অনৈতিকতার অভিযোগ সত্য হলেও তা কোনোভাবেই প্রকাশ্যে লাঞ্ছনা, দড়িতে বেঁধে নির্যাতন, সম্পদ লুট কিংবা সামাজিকভাবে অপমান করার বৈধতা তৈরি করে না। বরং অভিযোগের আড়ালে যদি পরিকল্পিত নির্যাতন, লুটপাট কিংবা কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলোরও পৃথক ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পুলিশের ভূমিকা। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নারী ও যুবককে উদ্ধার করে থানায় নেয়। পরবর্তী সময়ে যুবককে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় আদালতে পাঠানো হলেও ওই নারীকে মামলার বাদী করে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি; বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেছেন, যুবকের বিরুদ্ধে আগের একটি মামলাও ছিল এবং নতুন মামলায় তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে নারীকে একই মামলার বাদী করে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেননি।

এ জায়গাতেই জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়-একই ঘটনার দুই পক্ষের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগের ভিত্তি কী ছিল? ফুয়াদ আল হাসানের মন্তব্যে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, আইনের চোখে দুজনের অবস্থান যদি সমান হয়, তাহলে একজন বাদী এবং অন্যজন আসামি হলেন কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষোভ দিয়ে নয়, স্বচ্ছ তদন্ত ও দায়িত্বশীল প্রশাসনিক ব্যাখ্যার মাধ্যমেই দিতে হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সামান্য অস্পষ্টতাও যদি বৈষম্যের ধারণা তৈরি করে, তাহলে তা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করে।

ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তিগত আক্রোশের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যে সাদিয়া জাহান নামের এক নেটিজেন ওই নারীর বিরুদ্ধে পরিবার ভেঙে দেওয়া এবং বৃদ্ধদের অপমানের মতো বিভিন্ন অভিযোগের কথা বলেছেন। এসব অভিযোগ সত্য কি না, তার সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দিতে পারে না। কিন্তু এ ধরনের মন্তব্য একটি গভীর সামাজিক বাস্তবতা সামনে আনে- কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, পারিবারিক বিরোধ কিংবা স্থানীয় দ্বন্দ্ব যখন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিস্ফোরিত হয়, তখন জনতার একাংশ বেআইনি শাস্তিকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে। ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে যত অভিযোগই থাকুক, তার বিচার করার অধিকার আদালতের বাইরে কারও নেই।

আরো উদ্বেগের বিষয়, ঘটনার পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার চেষ্টা হয়েছিল বলে যে অভিযোগ উঠেছে। ১০০ টাকার অ-আদালতীয় স্ট্যাম্পে লেখা অঙ্গীকারনামায় অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ওই নারী আর এলাকায় আসবেন না- এমন প্রতিশ্রুতি নেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। যদি সেখানে নির্যাতন, লুটপাট বা বেআইনি আটক ও অপমানের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে কোনো ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামা দিয়ে সেসব অপরাধের দায় মুছে ফেলা যায় না।

ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত ও বিচার রাষ্ট্রের নির্ধারিত প্রক্রিয়াতেই হতে হবে। বদরগঞ্জের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন বলেও ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশে গণপিটুনিতে অন্তত ৩৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে অধিকার। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে এসব ঘটনার পেছনে চুরি-ডাকাতির সন্দেহ, অনানুষ্ঠানিক গ্রাম্য বিচার কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগসহ বিভিন্ন কারণ ছিল। বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ নাগরিক অধিকার সমাজের হিসাবে গণপিটুনির ২৬৩ ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন।

এই পরিসংখ্যান কেবল সহিংসতার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে একটি বড় প্রশ্নও রাখে- মানুষ কেন বিচারব্যবস্থার পরিবর্তে নিজেরাই বিচারক হয়ে উঠছে? এর উত্তর শুধু জনতার উচ্ছৃঙ্খলতায় খুঁজলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। দীর্ঘসূত্রতা, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অনাস্থা, অপরাধীর শাস্তি না পাওয়ার ধারণা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্যের দ্রুত বিস্তার- সবকিছু মিলেই গণবিচারের সংস্কৃতিকে উসকে দিতে পারে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণেও সাম্প্রতিক সময়ে গণসহিংসতা বৃদ্ধির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার ওপর জনআস্থার সংকটের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াতেও দুটি প্রবণতা স্পষ্ট।

জান্নাতুন মাওয়া ও হাফিজুর রহমানের মতো অনেকে নির্যাতন, লুটপাট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে অনেকে বিষয়টিকে ধর্মীয় ও সামাজিক নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করার চেষ্টা করছেন। ধর্মীয় বা নৈতিক মূল্যবোধ সমাজজীবনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যা বা সামাজিক রীতি রাষ্ট্রের প্রচলিত বিচারব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। রাষ্ট্রের আইনের বাইরে কোনো সমান্তরাল বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত দুর্বল ও অসহায় মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অতএব বদরগঞ্জের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এখন অপরিহার্য। কারা নারী ও যুবককে আটক করেছিল, কারা দড়িতে বেঁধে নির্যাতন করেছে, কারা লুটপাটে জড়িত, কে বা কারা ভিডিও ধারণ ও প্রচার করেছে, স্থানীয়ভাবে আপসের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়েছিল এবং পুলিশের প্রাথমিক ও পরবর্তী পদক্ষেপ আইনসম্মত ছিল কি না- প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।

কারণ, বিচার প্রতিষ্ঠার নামে যদি জনতা বিচারক হয়ে যায়, অভিযোগের নামে যদি শাস্তি শুরু হয়ে যায় এবং নৈতিকতার নামে যদি মানুষের মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের আদালত, পুলিশ ও আইনের প্রয়োজনই বা কোথায় থাকে? বদরগঞ্জের ঘটনা তাই কেবল একটি নারী ও এক যুবকের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নয়; এটি আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি-আমরা কি আইনের শাসনের সমাজ চাই, নাকি যার হাতে বেশি মানুষ, বেশি প্রভাব ও বেশি ক্ষমতা, তার রায়ই শেষ কথা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রশাসনকে নয়, পুরো সমাজকেই দিতে হবে। আইনের শাসন রক্ষা করতে হলে অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু সেই বিচার হতে হবে আইনের মাধ্যমে- জনতার দড়িতে নয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও কবি
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/০২.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

সবার আগে প্রয়োজন জনসেবার মানোন্নয়ন
০৩ অক্টোবর ২০২৬

সবার আগে প্রয়োজন জনসেবার মানোন্নয়ন

ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসানএকজন সাধারণ নাগরিকের কাছে সরকারের মান যাচাই হয় নীতিমালা, উন্নয়ন পরিকল্পনা কি...

কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি- কোথাও আসন নেই, কোথাও শিক্ষার্থী নেই: ভালো লক্ষণ না
০৩ অক্টোবর ২০২৬

কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি- কোথাও আসন নেই, কোথাও শিক্ষার্থী নেই: ভালো লক্ষণ না

নজরুল ইসলামবাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সামনে এসেছে। একদিকে নামী কলেজগ...

পরিচ্ছন্ন-পরিপাটিই অর্থনৈতিক অগ্রগতির চাবিকাঠি
০১ অক্টোবর ২০২৬

পরিচ্ছন্ন-পরিপাটিই অর্থনৈতিক অগ্রগতির চাবিকাঠি

এ টি এম আবু আসাদদেশের উন্নয়ন করতে হলে আমাদের হতে হবে সকল কাজে পরিচ্ছন্ন-পরিপাটি। নৈতিকতার দৃষ্টিতে প...

নদী অববাহিকা: নদী বাঁচলে জীবন বাঁচবে
০১ অক্টোবর ২০২৬

নদী অববাহিকা: নদী বাঁচলে জীবন বাঁচবে

শাকিল কবিরনদী শুধু একটি জলধারা নয়। নদী একটি জনপদের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাব...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আদালতে হেলমেট ছুড়ে আখতারুজ্জামান বললেন, কেন পরব

রিমান্ড শুনানির জন্য আদালতে নেওয়ার সময় মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন। শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। প্রিয় পাঠক আপনি কি মনে করেন তিনি সঠিক প্রশ্ন করেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 ঘন্টা আগে