নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সামনে এসেছে। একদিকে নামী কলেজগুলোয় একটি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়ছে ৩০ থেকে ৩৩টি পর্যন্ত; অন্যদিকে দেশের ৪১৬টি কলেজ-মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য কোনো শিক্ষার্থীই বরাদ্দ পায়নি। আরও প্রায় ৮০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে মাত্র ১ থেকে ১০ জন। ফলে কোথাও শিক্ষার্থীর জন্য হাহাকার, কোথাও আবার শিক্ষার্থীদের পছন্দের কলেজে আসন পাওয়ার জন্য হাহাকার। এই বৈপরীত্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনা, মান ও প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের নীতিকে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জানায়।
২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমের প্রথম ধাপের তথ্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সারা দেশে একাদশে ভর্তিযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৮ হাজার ১৮০টি এবং আসন প্রায় ২৫ লাখ। অথচ এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৪০ হাজারের কিছু বেশি। তাদের মধ্যে প্রথম ধাপে আবেদন করেছে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন। নির্বাচিত হয়েছে ৯ লাখ ৮০ হাজার ৮১৫ জন। অর্থাৎ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ একাদশে ভর্তির জন্য প্রথম ধাপে আবেদনই করেনি।
অন্যদিকে ১৪ হাজার ৪১৫ জন আবেদন করেও প্রথম ধাপে কোনো প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ পায়নি। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীও রয়েছে ২ হাজার ২০৫ জন। ফলে সমস্যাটি কেবল আসনের স্বল্পতার নয়; বরং শিক্ষার্থীর পছন্দ, প্রতিষ্ঠানের মান, অবস্থান, বিষয় ও আসনসংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ।
একাদশ শ্রেণিতে ৯৮১টি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৩২ হাজার ৬৭৮টি। ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ২ হাজার ৩৭৯টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ৩২ হাজার ৬৪০ জন। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তির তীব্র আগ্রহ, আর অন্যদিকে শত শত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীশূন্যতা- দুটি চিত্র পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
জেলা পর্যায়েও বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস মডেল কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ৪৫০টি আসন থাকলেও একজন শিক্ষার্থীও বরাদ্দ পায়নি। বরগুনার আমতলীর তিয়াখালী কলেজে ৩০০টি আসনের বিপরীতে নির্বাচিত হয়েছে মাত্র চারজন। আবার একেবারেই কোনো আবেদন পড়েনি এমন ১১টি কলেজের মধ্যে নয়টিই বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীন। এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় কি অতিরিক্ত কলেজ গড়ে উঠেছে?
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালে কলেজশিক্ষার আওতায় প্রতিষ্ঠান ছিল ৩ হাজার ৩২৪টি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৭৬টিতে। অর্থাৎ ১৪ বছরে প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১ হাজার ৫৫২টি বা প্রায় ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ শিক্ষার্থীর চাহিদা ও জনসংখ্যার ভৌগোলিক পরিবর্তনের সঙ্গে এই বিস্তারের সমন্বয় কতা হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে, প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ানোর পেছনে বিভিন্ন স্থানীয় ও অন্যান্য স্বার্থ কাজ করেছে। তার বক্তব্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো—কোথায় কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, ক্যাচমেন্ট এরিয়া এবং জাতীয় প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে দেশে যথাযথ ম্যাপিং করা হয়নি। ফলে একদিকে অতিরিক্ত আসন খালি থাকছে, অন্যদিকে পছন্দের কলেজে আসন না পেয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। শিক্ষার্থী সংকটের পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষকসংকটও। সরকারি কলেজগুলোর চিত্র আরো উদ্বেগজনক।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ৬৩২ সরকারি কলেজের মধ্যে ১৪১টিতে অধ্যক্ষ নেই। একই সঙ্গে সরকারি কলেজগুলোয় অনুমোদিত শিক্ষক পদের ২ হাজার ৮৭৮টি শূন্য। কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীসংখ্যার তুলনায় শিক্ষক কম আবার শিক্ষার্থীহীন বা অতি কম শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক বেশি- এমন অসামঞ্জস্যও রয়েছে। এ অবস্থায় শুধু নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠা কিংবা পুরোনো কলেজের আসন বৃদ্ধির নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন একটি জাতীয় পর্যায়ের কলেজ ম্যাপিং। কোন এলাকায় কত শিক্ষার্থী আছে, আগামী ১০ বছরে শিক্ষার্থীর সম্ভাব্য সংখ্যা কত হবে, কোন প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষকমান কেমন- এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা জরুরি।
যেসব কলেজে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী নেই বা অতি নগণ্য, সেগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী একীভূত করা, বিষয় ও শিক্ষার ধরন পরিবর্তন করা অথবা কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তরের বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষকশূন্য পদ দ্রুত পূরণ, যোগ্য অধ্যক্ষ নিয়োগ, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের দায়িত্বশীলদের সামনে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন- আমরা কি শুধু কলেজের সংখ্যা বাড়াতে চাই, নাকি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাই? ৪১৬টি কলেজে শিক্ষার্থী না পাওয়া সেই প্রশ্নেরই কঠিন উত্তর দাবি করছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যত বেশি হবে, শিক্ষা ভালো হবে- এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। শিক্ষার মান নির্ভর করে দক্ষ শিক্ষক, কার্যকর ব্যবস্থাপনা, উপযুক্ত অবকাঠামো, শিক্ষার্থীর চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগের ওপর। তাই এখন সময় এসেছে সংখ্যার প্রতিযোগিতা বন্ধ করে প্রয়োজন, মান ও শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে কলেজশিক্ষার নতুন পরিকল্পনা করার। তা - না হলে একদিকে কলেজ থাকবে, শিক্ষক থাকবে, ভবন থাকবে- শুধু থাকবে না শিক্ষার্থী; আর অন্যদিকে হাজারো শিক্ষার্থী পছন্দের প্রতিষ্ঠানে একটি আসনের জন্য ছুটবে। এই বৈপরীত্য কোনো সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার ভালো লক্ষণ হতে পারে না। এ সমসার অনেকাংশেই সমাধান করা সম্ভব।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজচিন্তক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬