ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার জ্যোতিনগর কলোনিতে দুই মাসের বেশি সময় ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে কলোনির বাসিন্দাদের দুর্ভোগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য সমীরুল ইসলাম।
সম্প্রতি উত্তর কলকাতার এই কলোনিতে পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা এবং বাসিন্দাদের উচ্ছেদের নোটিশ ঘিরে জটিলতা তৈরি হয়েছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্ট ট্রাস্টের অধীন প্রায় ৩ হাজার ৪৭৮ বর্গমিটার জমিতে গড়ে ওঠা কলোনিটিতে দীর্ঘদিন ধরে বহু মুসলিম পরিবার বসবাস করছে।
জাতিসংঘকে পাঠানো চিঠিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে সমীরুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ হিসেবে কলোনির পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, বাসিন্দারা নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের হওয়া এবং একটি রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাংকের অংশ না হওয়ায় তাঁদের এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে।
কলোনির পাঁচটি পানির কল দিয়ে আগে প্রতিদিন ভোর পাঁচটা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পানি পাওয়া যেত। কিন্তু গত ২৯ জুলাই থেকে কলগুলো দিয়ে পানি আসছে না।
বাসিন্দাদের ভাষ্য, ২৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত কলোনির সামনের সড়কে কলকাতা পৌর সংস্থার মাধ্যমে পাইপলাইন সংস্কারের কাজ হয়েছিল। ওই সময় পানি সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল এবং স্থানীয় বাসিন্দারা পৌর সংস্থার কাছে কোনো অভিযোগও করেননি। এরপরও ২৮ জুলাই রাত ১১টার দিকে সড়ক মেরামতের নামে কলোনির মূল পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পরদিন সকাল থেকে পুরো এলাকা পানিশূন্য হয়ে পড়ে। একই সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়।
বাসিন্দারা জানান, বিদ্যুৎ বণ্টনকারী সংস্থা ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই করপোরেশন অবৈধ সংযোগ নেওয়ার সন্দেহে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করেছিল। তবে তাঁদের দাবি, প্রতিটি বাড়িতে বৈধ বিদ্যুৎ মিটার রয়েছে এবং তাঁরা নিয়মিত বিল পরিশোধ করেন। এরপরও প্রায় ১০ দিন বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়। স্থানীয় একটি ক্লাবের প্রতিবাদ এবং সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানোর প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে পরে বিদ্যুৎ সরবরাহ আংশিকভাবে এবং শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি চালু করা হয়। তবে পানির সংকট অব্যাহত রয়েছে।
পানি সরবরাহ পুনরুদ্ধারের জন্য বাসিন্দারা স্থানীয় কাউন্সিলর, থানার পুলিশ ও বিজেপির স্থানীয় বিধায়ক রিতেশ তিওয়ারির কাছে গিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখতে যাননি। বরং তাঁদের কাছে যাওয়া নারী প্রতিনিধিদের বিধায়ক জানিয়েছেন, পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করার জন্য তিনি দায়ী নন এবং পানি সরবরাহ পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নেবেন না। বিধানসভা নির্বাচনের ঘোষণার পর তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, আগামী পাঁচ বছর বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের জন্য কোনো কাজ করবেন না বা কোনো প্রশংসাপত্র দেবেন না। এ বক্তব্য স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
জাতিসংঘকে লেখা চিঠিতে সমীরুল ইসলাম বলেছেন, পর্যাপ্ত ও নিরাপদ পানি এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত মানবাধিকারের অংশ। পানির অভাবে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত বাসিন্দাদের মধ্যে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, পানি সরবরাহ বন্ধ করা মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে কলোনির বাসিন্দাদের আশঙ্কা, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের পেছনে জমি খালি করা এবং তাঁদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা রয়েছে। আইনি নথি অনুযায়ী, জ্যোতিনগর কলোনির জমির মালিক কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের এস্টেট কর্মকর্তা ওই জমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের নির্দেশ জারি করেন। বাসিন্দারা জুনের দিকে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হন। কলকাতা হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানির পর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উচ্ছেদপ্রক্রিয়ার ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেন।
কলোনিবাসীর আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ও শামিম আহমেদের বক্তব্য, সরকারি সম্পত্তি থেকে কাউকে উচ্ছেদের আগে ১৯৭১ সালের সরকারি সম্পত্তি আইন অনুযায়ী কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক। তাঁদের অভিযোগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়ম মেনে নোটিশ না দিয়েই কলোনি খালি করার নির্দেশ দিয়েছিল। জমিটি বন্দরের হলেও সাধারণ মানুষের বাসস্থান ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানিয়েছে, ১৯৯০ সাল থেকে কলোনি গড়ে ওঠায় জমি বাবদ তাদের আনুমানিক ৬১ কোটি রুপির বেশি লোকসান হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১৯ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া কলোনিতে অনিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক তার ও দাহ্য পদার্থের কারণে অগ্নিকাণ্ড এবং নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে বলে থানায় অভিযোগ করা হয়েছিল।
পানি সরবরাহ পুনরুদ্ধারের দাবিতে বাসিন্দাদের করা পৃথক আবেদন বর্তমানে নগর দেওয়ানি আদালতে বিচারাধীন। দীর্ঘদিন ধরে পানির সংকট এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনায় কলোনিবাসীদের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৪/১০/২০২৬