ড. সুজিত কুমার দত্ত
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাইকে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে তার দীর্ঘদিনের অবদান এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় সাহসী ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি তাকে এই সম্মাননা দিয়েছে। কিন্তু এই স্বীকৃতির মধ্যেই বিশ্বরাজনীতির এক গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, যারা ন্যায়বিচার ও শান্তির পক্ষে কাজ করেন, তাদের সম্মানিত করলেই কি যুদ্ধ, আগ্রাসন ও মানবিক বিপর্যয় থেমে যায়?
নাভি পিল্লাইয়ের অর্জন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনামলে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই থেকে শুরু করে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দায়িত্ব তার কর্মজীবনের মূল সুর ছিল অপরাধের দায় নির্ধারণ ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা। এই পুরস্কার মনে করিয়ে দেয়- শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবিক মর্যাদা, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। তবে নোবেল শান্তি পুরস্কার একটি নৈতিক স্বীকৃতি, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ নয়।
পুরস্কার কোনো রাষ্ট্রকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারে না, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে পারে না কিংবা শক্তিধর রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করার নিজস্ব ক্ষমতা রাখে না। এখানেই পুরস্কারের নৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের দিকে তাকালে এই ব্যবধান আরো স্পষ্ট হয়। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষত গাজায় যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ সত্ত্বেও সহিংসতা ও মানবিক সংকট অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়- যুদ্ধবিরতির এক বছর পরও গাজার পুনর্গঠন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ক্ষতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরছে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইউক্রেনে ২ হাজার ২২২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ১৩ হাজার ৫৮ জন আহত হয়েছেন। ইরান ঘিরে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিও দেখিয়ে দিচ্ছে, আঞ্চলিক সংঘাত কীভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব সংকটের প্রতিটিই আলাদা ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। কিন্তু একটি সাধারণ প্রশ্ন সবক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেন সংঘাত প্রতিরোধে প্রত্যাশিত কার্যকারিতা দেখাতে পারছে না? এর উত্তর খুঁজতে হলে বিশ্বব্যবস্থার ক্ষমতার কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। জাতিসংঘ সনদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করলেও নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা অনেক সংকটে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
যখন কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র নিজের মিত্রের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি ঠেকাতে কিংবা নিজের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে বাধা দেয়, তখন আইনের সর্বজনীনতার ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এখানেই নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংকট। আন্তর্জাতিক আইন কেবল দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য হবে আর শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে তার প্রয়োগ নির্ধারণ করবে- এমন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে একই অপরাধের ক্ষেত্রে একই নীতির প্রয়োগ, যথাযথ প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক পরিচয়, নির্বিশেষে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। তাই নাভি পিল্লাইয়ের স্বীকৃতি শুধু একজন ব্যক্তির অর্জন নয়; আন্তর্জাতিক আইনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার প্রতিও একটি বার্তা।
নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কেউ একে শান্তির পক্ষে সাহসী অবস্থানের স্বীকৃতি হিসেবে দেখেছেন, কেউ আবার এর মধ্যে রাজনৈতিক বার্তা বা কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন খুঁজেছেন। এ ধরনের বিতর্ক পুরস্কারের গুরুত্বকে পুরোপুরি নাকচ করে না; বরং মনে করিয়ে দেয় যে শান্তির ধারণাটিও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাইরে নয়।
নাভি পিল্লাইয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও অপরাধের জবাবদিহির প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাজের মূল্যায়ন হওয়া উচিত প্রমাণ, ন্যায়বিচার ও আইনি নীতির ভিত্তিতে জাতীয় আনুগত্য বা ভূরাজনৈতিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে নয়। একইভাবে নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তকে বিশ্বশান্তির চূড়ান্ত সনদ হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক অবস্থান। তবে বাস্তব পরিবর্তন নির্ভর করে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পদক্ষেপের ওপর।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রথম প্রয়োজন আন্তর্জাতিক আইনের ধারাবাহিক ও বৈষম্যহীন প্রয়োগ। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়া এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা বাড়ানো জরুরি। ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর উদ্যোগ, গণহত্যা ও ব্যাপক নৃশংসতার পরিস্থিতিতে স্থায়ী সদস্যদের সংযম এবং সাধারণ পরিষদসহ অন্যান্য বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা শক্তিশালী করার বিষয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ, আস্থা তৈরির ব্যবস্থা এবং সামরিক উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ বাড়াতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও সংলাপ বন্ধ হয়ে গেলে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে।
উন্নয়নশীল ও ছোট রাষ্ট্রগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশসহ গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইনের সমান প্রয়োগ, শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি, জাতিসংঘের সংস্কার এবং মানবিক সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিত অবস্থান নিতে পারে। শান্তিরক্ষায় অবদান, মধ্যস্থতা, শরণার্থী সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করেও এসব রাষ্ট্র কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে ন্যায়বিচার ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন। কিন্তু এই স্বীকৃতির প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বার্তাকে কতা বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারে তার ওপর।
পুরস্কার যুদ্ধ থামাতে পারে না; পারে না ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘর ফিরিয়ে দিতে কিংবা ধ্বংস হওয়া সমাজ পুনর্গঠন করতে। এসবের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আইনের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার। তাই শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি- নোবেল শান্তি পুরস্কার বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করতে পারবে কি না, শুধু তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, বিশ্বনেতারা কি শান্তি ও ন্যায়বিচারের যে মূল্যবোধকে পুরস্কৃত করা হয়, তা নিজেদের নীতি ও আচরণে প্রয়োগ করতে প্রস্তুত? যদি আন্তর্জাতিক আইন কেবল বক্তৃতা ও পুরস্কার বিতরণের অনুষ্ঠানে সম্মানিত হয়; কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে উপেক্ষিত থাকে, তাহলে বিশ্বশান্তি অধরাই থেকে যাবে। শান্তির পুরস্কার গুরুত্বপূর্ণ। তবে শান্তির বাস্তবতা গড়ে তুলতে হলে নৈতিক স্বীকৃতিকে রাজনৈতিক দায়িত্ব, আইনি জবাবদিহি এবং কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টার
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬