নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অন্যতম বড় সংকট। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম, সীমিত আয় এবং বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে ক্রমেই দুর্বিষহ করে তুলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে স্বস্তি মিলছে না সাধারণ মানুষের।
মূল্যস্ফীতির এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের নীরব হাহাকার। যারা দিনমজুরি, রিকশা চালানো, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা স্বল্প বেতনের চাকরি করে সংসার চালান, তাদের আয় বাড়ছে না পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ফলে মাসের শুরুতেই যে সংসারের বাজেট তৈরি হয়, মাসের মাঝামাঝি তা ভেঙে পড়ে। মাছ-মাংসের পরিবর্তে ডাল-সবজি, পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে কম দামের খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পরিবর্তে চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। প্রশ্ন হলো, এভাবে আর কত দিন চলবে?
মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে নির্মম দিক হচ্ছে, এর অভিঘাত সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। উচ্চ আয়ের মানুষ বাড়তি খরচ সামাল দিতে পারলেও নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে সেই সুযোগ নেই। তাদের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার পেছনে। ফলে এসব খাতে সামান্য ব্যয় বৃদ্ধি হলেও সংসারের অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কাটছাঁট করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ, ধার কিংবা সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে হয়। এতে দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ে এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির মূল্য, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক মুনাফার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষ করে কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলেও ভোক্তাকে অনেক সময় বেশি দাম দিতে হয়। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী দীর্ঘ বিপণন ব্যবস্থায় কারা কত মুনাফা করছেন, তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। বাজার তদারকির দুর্বলতা ও প্রতিযোগিতার অভাব থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীরা ওই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে বাজারে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, মজুত, পাইকারি ও খুচরা মূল্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুতদারি এবং কারসাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু অভিযান ও জরিমানা নয়, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করাও জরুরি। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপণ্য বিক্রি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের আয় ও মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ আয় না বাড়িয়ে শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিলে মানুষের জীবনযাত্রায় প্রকৃত স্বস্তি ফিরবে না।
মনে রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতি কেবল অর্থনীতির একটি সূচক নয়; এটি মানুষের খাবারের থালা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বেঁচে থাকার অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির বার্তা নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্ক সংকেত। বাজার স্থিতিশীল করা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কাগজে-কলমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই হোক প্রধান অগ্রাধিকার।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজচিন্তক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬