ওমর আলী
বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ লক্ষাধিক মানুষ চোখে ছানি পড়ার কারণে অন্ধত্বের ঝুঁকিতে আছে। সম্প্রীতি ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অফ ব্লাইন্ডনেস এর প্রধান নির্বাহী ঢাকায় এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে এই তথ্য দিয়েছেন। উদ্বেগজনক এই তথ্য জানার পর নড়েচড়ে বসে সরকার। অকালে অন্ধত্বের ঝুঁকিতে থাকা ১০ লাখ ছানিপড়া রোগীর অস্ত্রপচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে এই ১০ লাখ চোখের ছানি অস্ত্রপচার করা হবে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত গত ৮ অক্টোবর রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে এ কথা জানান। কিন্তু ১০ লাখ চোখের ছানি অস্ত্রপচার করতে পাঁচ বছর লাগবে কেন? আর আগামী ৫ বছরে আরও কয়েক লাখ ছানি পড়া রোগী এদের সাথে যোগ হবে, তাদের অস্ত্রপচার কখন করা হবে?
বাংলাদেশে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে চক্ষু বিভাগ থাকলেও সেখানে চিকিৎসা ও অস্ত্রপচারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। বেশিরভাগ হাসপাতালে চোখের ডাক্তার পদ শূণ্য, চোখের অপারেশনের ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি হাসপাতালে বা ক্লিনিকে কিছু সংখ্যক চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকলেও তাদের ফি অনেক বেশি। তাই সাধারণ মানুষের পক্ষে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াও অসম্ভব। ফলে দিন দিন বাড়ছে চোখে ছানিপড়া রোগীর সংখ্যা।
দেশে চোখের চিকিৎসার জন্য দুটি সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনষ্টিটিউটের আউটডোরে প্রতিদিন হাজার হাজার চক্ষু রোগীর উপচেপড়া ভীড় দেখা যায়। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসা, অপারেশনের পাশাপাশি চক্ষু চিকিৎসায় উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। অপর চক্ষু হাসপাতালটি হচ্ছে গোপালগঞ্জ সরকারি চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ ইনষ্টিটিউট। রাজধানীর বাইরে হওয়াতে চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ কর্মস্থলেই থাকেন না। যাদেরকে পদায়ন করা হয়, অল্পদিন পরই তারা বদলীর তদবির শুরু করেন। অনেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের অজুহাতে গোপালগঞ্জ ত্যাগ করেন।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অফ ব্লাইন্ডনেস এর তথ্য অনুযায়ী ১০ লাখ ছানিপড়া চক্ষু রোগীর অস্ত্রপচার করার জন্য দরকার সমন্বিত ডিজিটাল পরিকল্পনা। বিদ্যমান ব্যবস্থায় দেশের যেসব মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চোখের ছানির অপারেশন করার ব্যবস্থা আছে, সবগুলোকে দ্রুত প্রস্তত করতে হবে। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন ও অপারেশনের এপয়েন্টমেন্ট এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ করে যেখানে যতটি অপারেশন থিয়েটার আছে, সবগুলো দিনরাত ব্যবহার করে প্রতিদিন অপারেশন করতে হবে।
গোপালগঞ্জ সরকারি চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ ইনষ্টিটিউটে বর্তমানে ৪টি অপারেশন থিয়েটার আছে। জনবল সংকটের মধ্যেও সপ্তাহে প্রায় ৫০০ ছানিপড়া রোগী অপারেশন করা হয়। অপারেশনের তিনদিন পর রোগীদের ছুটি দেয়া হয়। তারপর নতুন রোগী ভর্তি হয়। এখানে আরও অন্তত ২০টি অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আছে। ২০০ শয্যার এই চক্ষু হাসপাতালে দিন রাত অপারেশন করার জন্য অন্তত ১০০জন ডাক্তার অস্থায়ীভাবে ঢাকা থেকে প্রেষণে নিয়োগ করা যেতে পারে। দিনে রাতে কয়েক শিফটে অপারেশন করা হলে এক বছরে অন্তত দুই লাখ রোগীর অপারেশন গোপালগঞ্জে করা সম্ভব। ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনষ্টিটিউট, সারা দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোতেও একইভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হলে উক্ত ১০ লাখ ছানিপড়া রোগীকে এক বছরের মধ্যেই অপারেশন করা সম্ভব।
জনবল সংকট নিরসনে অবসরে যাওয়া চক্ষু চিকিৎসকদের চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ এবং গরফ-খবাবষ ঙঢ়যঃযধষসরপ চবৎংড়হহবষ (গখঙচ) প্রশিক্ষণ কোর্সধারী চিকিৎসকদের হাসপাতালগুলোতে দ্রুত নিয়োগ করা দরকার। প্রবাসী চক্ষু চিকিৎসকদেরকেও অনলাইনে রেজিস্ট্রেশানের মাধ্যমে বাংলাদেশে ছুটি কাটাতে আসার সময়কালে অস্ত্রপচারের কাজের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। চোখের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবল তৈরিতে ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনষ্টিটিউট ও গোপালগঞ্জ সরকারি চক্ষু হাসপাতালে গখঙচ কোর্সের আসন বৃদ্ধি করে আগামী পাঁচ বছরে অন্তত এক হাজার মিড লেভেল চক্ষু চিকিৎসক গড়ে তোলা দরকার।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬