গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

ধৈর্যের অভাব: আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকট

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৩৫ পিএম, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:৩৪ এএম ২০২৬
ধৈর্যের অভাব: আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকট
ছবি

ছবি সংগৃহীত

শেখ আশাফুজ্জামান

জাতি হিসেবে আমরা ধৈর্য ধরতে পারি না- এ তেতো সত্যটি নানা সময়ে বহু ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষত আমাদের রাজনীতি যেন এর উৎকৃষ্ট নিদর্শন। একটি রাজনৈতিক দল যখন নির্বাচনের মাধ্যমে বা ক্ষমতার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে আসে, তারা নির্ধারিত মেয়াদের জন্য সরকার চালাবে- এটাই সাধারণ নিয়ম। সেই সরকার তাদের নীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে, কাজ করবে। প্রশ্ন হলো, বিরোধী দল কেন সে সময়টুকু গঠনমূলক ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়? কেন তারা প্রথম দিন থেকেই দায়িত্বশীল সমালোচনার বদলে অস্থিতিশীলতা ও সহিংস রাজনীতির পথ বেছে নেয়?

একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দল সরকারের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সরকার যেখানেই ভুল করবে, বিরোধী দলই হবে সেই আয়না, যা সত্য প্রতিফলিত করবে। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে বিরোধী দল যেন অপেক্ষা করার ধৈর্যটুকুও হারিয়ে ফেলে। রাজনৈতিক এই অধৈর্য কেবল সরকারের স্বাভাবিক কাজকর্মকেই ব্যাহত করে না, বরং পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে তোলে। আমরা কি কোনোদিন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে পারব- যেখানে বিরোধী দল নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করবে, সাধারণ মানুষের পাশে থাকবে, সরকারের ইতিবাচক কাজকে স্বাগত জানাবে এবং গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে ভুলত্রুটির জবাবদিহি নিশ্চিত করবে?

আমাদের এই অসংযম ও ধৈর্যহীনতার সংস্কৃতি কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা সমাজজীবনের নানা স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। এই প্রসঙ্গে একটি প্রাচীন উপাখ্যান স্মরণ করা যেতে পারে- এক রাজ্যে প্রতি রাতে রাজপ্রাসাদে রাজপুত্রের জন্য নৃত্যানুষ্ঠান হতো। নিয়ম ছিল, নর্তকী নাচতে নাচতে একসময় রাজপুত্রের সামনে এসে মূর্ছা যাবে- এটাই ছিল অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ। এক রাতে অনেক সময় পার হলেও নর্তকী কিছুতেই রাজপুত্রের সামনে এসে মূর্ছা যাচ্ছিল না। রাজপুত্র ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। তখন এক প্রবীণ ও জ্ঞানী মন্ত্রী উঠে এসে বললেন, “বৎস, ধৈর্য ধরো। রাত এখনো শেষ হয়নি। শেষ প্রহর পর্যন্ত অপেক্ষা করো- দেখবে, নর্তকী ঠিকই মূর্ছা যাবে। তুমি এই রাজ্যের আগামী কর্ণধার; তুমিই যদি ধৈর্য হারিয়ে ফেলো, তবে তো রাজ্যের ভবিষ্যৎ অন্ধকার!” এ ছোট গল্পটি যেন আমাদের বর্তমান সমাজেরই এক স্পষ্ট দর্পণ।

রাজনীতি কোনো যুদ্ধ নয়; মতভেদ থাকা সত্ত্বেও একে অন্যকে শ্রদ্ধা করা, প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখা এবং দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করাই রাজনৈতিক পরিপক্বতা। কিন্তু ক্ষমতার বাইরে থাকা মাত্রই অধৈর্য হয়ে ওঠা ও অস্থিতিশীলতা তৈরির প্রবণতা রাজপথের রাজনীতির মূল পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। এতে হয়তো সাময়িকভাবে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। কিন্তু রাষ্ট্রের গুণগত কোনো পরিবর্তন হয় না। আজ নিজেদের ভেতরে তাকানোর সময় এসেছে। আমরা কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমন এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি দিয়ে যাব- যেখানে পরাজয় মানেই সহিংসতা আর ক্ষমতা মানেই সুযোগসন্ধান?

আমাদের সমাজে ধৈর্যের ঘাটতি আজ সর্বত্র স্পষ্ট- পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা ব্যবসায়। আমরা সবাই তড়িঘড়ি ফল পেতে চাই, জিততে চাই। কিন্তু অপেক্ষা করার মানসিকতাটুকু হারিয়ে ফেলেছি। ফলে আমাদের ভৌত উন্নয়ন হয়তো হচ্ছে, কিন্তু মানবিক ও নৈতিক সভ্যতার বিকাশ থমকে আছে। জাতি হিসেবে আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- ধৈর্য, সহনশীলতা ও মূল্যবোধের চর্চা পুনরুজ্জীবিত করা। এই চর্চার সূচনা হোক রাজনীতি থেকে এবং তা ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের সর্বস্তরে। তবেই আমরা পাবো অর্থবহ উন্নয়ন, একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল এবং সুসংহত গণতন্ত্র।

ধৈর্য যখন হারিয়ে যায়, তখন দিশা হারায় পুরো জাতি। আর দিশাহীন জাতির ভবিষ্যৎ কখনো আলোকিত হতে পারে না।

লেখক: প্র্যাকটিসিং পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ইন্ডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর ও চেয়ারম্যান, বোর্ড অডিট কমিটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

দুই বছরে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়: শূন্য থেকে স্বপ্নের পথে
০৮ অক্টোবর ২০২৬

দুই বছরে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়: শূন্য থেকে স্বপ্নের পথে

প্রফেসর ড. মোহা. হাছানাত আলীএখন থেকে ঠিক দুই বছর আগে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ...

ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে গঙ্গা চুক্তি, তারপর কী হবে?
০৭ অক্টোবর ২০২৬

ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে গঙ্গা চুক্তি, তারপর কী হবে?

খায়ের মাহমুদনদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের কাছে নদী কেবল ভূগোলের অংশ নয়। নদীর সঙ্গে আমাদের কৃষি, জীবিকা...

মতপার্থক্য হোক মর্যাদার
০৭ অক্টোবর ২০২৬

মতপার্থক্য হোক মর্যাদার

আবু সায়েমনিয়মিত না হলেও আমি ফেসবুকে পোস্ট দিই কিংবা অন্যদের পোস্ট পড়ি। ভালো লাগে। পাশাপাশি মানুষের স...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই