আবু সায়েম
নিয়মিত না হলেও আমি ফেসবুকে পোস্ট দিই কিংবা অন্যদের পোস্ট পড়ি। ভালো লাগে। পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে কানেক্টেড থাকার আনন্দও আছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে। তাদের মন্তব্য ও যুক্তিতর্ক পড়ে আমি অনেক কিছু শিখতে পারি। ঠিক কীভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাদের অবস্থান থেকে তা বোঝার চেষ্টা করি এবং দারুণভাবে সম্পৃক্ত হতে পারি। তাদের অনুভূতি ও দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারি বিধায় বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে আমার সখ্য বেশ ভালো।
আমি অনেকের সঙ্গে ফোনে কিংবা সরাসরি সাক্ষাতেও কথা বলি। তবে খাজুরে গল্প করার জন্য নয়, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে। অযথা প্যাঁচাল পাড়ার সময় যেমন আমার নেই, তেমনি রাজনীতির জন্য এর প্রয়োজন আছে বলেও মনে করি না। বরং আমি বিশ্বাস করি, দেশের ভালো চাইলে আমাদের সবাইকেই সস্তা রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাজনীতি চর্চা করতে হবে।
আমরা যদি একে অন্যকে সম্মান দেখিয়ে নিজেদের জ্ঞান, বুদ্ধি, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিই, তাহলে সবাই লাভবান হব। দেশও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারবে। নয়তো পঞ্চান্ন বছর ধরে দেশ হিসেবে যে জঞ্জাল টেনে চলেছি, সভ্য দুনিয়ায় যে হাস্যকর অবস্থানের সঙ্গে লড়ছি, তার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হবে না। নিজেদের গালে নিজেদের মারা জুতার বাড়ি খেয়ে বেঁচে থাকব আমরা। আর সারাক্ষণ অন্যের সমৃদ্ধির গল্প বলতে বলতে জীবন পার করে দেব।
রাজনৈতিক ধস্তাধস্তির শিল্পমঞ্চে কেউ হয়তো সাময়িক ক্ষমতা ভোগ করবে, কেউ শক্তিমত্তা জাহির করবে, কেউ টাকা কামিয়ে জৌলুশ করবে, কেউ বিদেশে পাড়ি জমানোর বন্দোবস্ত করবে। কিন্তু দিন শেষে বিশ্বদরবারে অসম্মান ছাড়া আর কিছুই অর্জিত হবে না, হতে পারে না। ব্যক্তিমর্যাদা তো কবেই বিসর্জন দিয়ে বসেই আছি।
আমি পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করেছি। পৃথিবীর বড় বড় মানুষের দরবারে হাজির হয়ে দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য আর্জি পেশ করেছি। আমি জানি, এ দেশকে তারা কী চোখে দেখে। এসব নিয়ে ভবিষ্যতে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে আছে। আপাতত কেবল দু-একটি তথ্য দিই।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট একবার আমাদের বলেছিলেন, দুঃখজনক হলেও বৈশ্বিক আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশ তলানিতেও নেই। তার চেয়েও বড় একজন আরেকবার শেখ হাসিনার প্রশংসা করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছিলেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি বোঝাতে আমাদের কী পরিমাণ ঘাম ঝরাতে হতো, আল্লাহ জানেন। তারা এমনকি আফ্রিকার অনেক রাষ্ট্রকেও গুরুত্বের চোখে দেখতেন; সোনার বাংলাকে নয়।
’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পরও আমরা আজ ঢিল ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত। মিথ্যাচার, প্রোপাগান্ডা, বট আক্রমণ দিয়ে আমরা যেন নিজেদের ধ্বংস করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছি। আমাদের নিজেদের কিছু লোক, দল বিক্রি করে অপরাধে লিপ্ত থাকা কিছু মানুষ কিংবা হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর শুভাকাঙ্ক্ষী বনে যাওয়া ফ্যাসিবাদের কিছু দোসরজাতীয় তিক্ততা সৃষ্টিতে পরিকল্পিত ভূমিকা রাখছে বলে আমার মনে হয়। আমরা বুঝতে পারছি না, নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করছি? অন্যদিকে গুণগত মানের রাজনীতি থেকে বিরোধীরাও দূরে সরে যাচ্ছে। দফার পর দফা উপস্থাপন করে তারা এক দফায় নেমে যেতে চায়।
চাইলে দীর্ঘ ফিরিস্তি দিতে পারি। কিন্তু আমি সরকারি দলের লোক। তাই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় তুলব না। তবে জনগণ কাউকেই ছাড়বে না। বললে হয়তো কিছু মানুষ অযথাই তেড়ে আসবে। কিন্তু সত্য বলার সাহস ও অধিকার যদি না রাখি, তাহলে জ্ঞানচর্চা করে লাভ কী? ধ্রুপদি রাজনীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের প্রধানমন্ত্রী একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইছেন—এমনটাই আমি দেখতে পাই। ‘আমাদের’ মানে সবার। তিনি সকলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পথ হাঁটবেন—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। অসংখ্য উদাহরণ দিতে পারি। কিন্তু এ লেখার যে নিরপেক্ষ ওজন আছে, তা নষ্ট হবে বিধায় সেগুলো দিচ্ছি না।
কেউ ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নন; প্রধানমন্ত্রীও নন। তার কাজের সমালোচনা থাকবেই। তবে তার শারীরিক ভাষা, চলন-বলন এবং প্রকাশ্য অবস্থান থেকে আমার কাছে মনে হয়, তিনি কর্তৃত্ববাদী রাজনীতিতে ফিরে যেতে চান না। সরকারের যেসব কাজে জনগণ বা বিরোধী দলের সমালোচনা কিংবা দ্বিমত আছে, সেগুলোরও সহজ সমাধান আছে। সংসদে এবং সংসদের বাইরে বেশি বেশি আলোচনা হলে অধিকাংশ বিরোধেরই নিরসন সম্ভব।
আমার স্পষ্ট কথা- আমরা পরিশীলিত ও মার্জিত রাজনীতির চর্চা দেখতে চাই। জাতি আর হিংসা-বিদ্বেষের রাজনীতি চায় না। ঝগড়া হোক, বিতর্ক হোক- সমস্যা নেই। কঠিন সমালোচনা, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ আরও বাড়ুক। কিন্তু মিথ্যাচার, গালিগালাজ, কুৎসা, অশ্লীলতা ও নোংরামি পরিহার করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে সংঘাতের রাজনীতি ফিরিয়ে আনা যাবে না। মনে রাখতে হবে, বিভাজন সৃষ্টির স্বার্থে ফ্যাসিবাদীসহ নানা পক্ষ অনলাইন-অফলাইনে উসকানি দিতে পারে। তাদের ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। বলেছি, আমাদের দেশকে অন্যরা কী চোখে দেখে- আমি জানি। আবারও বলছি, বিশ্বদরবারে আমরা ভালো অবস্থানে নেই। যারা ভিন্ন কিছু বলেন, তারা হয়তো দেশের মর্যাদা বাড়াতে নিজেদের মতো করে বয়ান সৃষ্টি করেন। তারাও জানেন, তারা সত্য বলছেন না। আমি বলব, বাস্তবতা আমাদের আরও কঠিন আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশে মানবিক মর্যাদার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনীতিবিদেরা একে অন্যকে শত্রু না ভেবে প্রতিদ্বন্দ্বী ও সহযাত্রী হিসেবে দেখবেন। প্রয়োজনে একজন আরেকজনের সহযোগিতা চাইবেন। একজন না চাইলেও অন্যজন প্রয়োজনের সময়ে এগিয়ে আসবেন, গুটি খেলবেন না। রাজনীতিতে মতের পার্থক্য থাকবে, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থাকবে, তীব্র বিতর্কও থাকবে। কিন্তু শত্রুতা, ঘৃণা ও অমানবিকতা যেন আর রাজনীতির অস্ত্র হয়ে না ওঠে।
কে না জানে, বিশ্বে এমন বহু দেশ রয়েছে- যেখানে রাজনৈতিক সংঘাত ও চরম মেরুকরণ আখেরে সামরিক হস্তক্ষেপ কিংবা স্বৈরাচারী শাসনের পথ তৈরি করেছে। দক্ষিণ এশিয়াতেই বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড জ্বলন্ত উদাহরণ। আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশের কথা নাই-বা টানলাম।
শেষ কথা- ফ্যাসিবাদে আর ফেরার সুযোগ নেই। ফ্যাসিবাদ ডেকে আনলে এই জাতি তার অস্তিত্ব হারাবে।
লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, রাজনৈতিক কর্মী ও হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬