গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

চাঁদাবাজির অভিযোগ: দায় ব্যক্তির, দায় কি দলেরও?

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৩৯ পিএম, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:২৯ এএম ২০২৬
চাঁদাবাজির অভিযোগ: দায় ব্যক্তির, দায় কি দলেরও?
ছবি

ছবি সংগৃহীত

সিরাজুল ইসলাম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। ক্ষমতাসীন দলকে বিরোধীরা অভিযুক্ত করবে, সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরবে, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলবে- গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এসব স্বাভাবিক। কিন্তু অভিযোগ আর প্রতিষ্ঠিত সত্য এক বিষয় নয়। অভিযোগ যখন প্রমাণের অপেক্ষা না করে কোনো রাজনৈতিক দলের সামগ্রিক পরিচয়ে পরিণত করা হয়, তখন সেটি আর কেবল রাজনৈতিক সমালোচনা থাকে না; তা হয়ে উঠতে পারে একটি দল ও তার বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীকে সামাজিকভাবে হেয় করার মাধ্যম।

সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজির কোনো ঘটনা ঘটলেই কিংবা কখনো ঘটনার প্রকৃতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই বিএনপির নাম জড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির বক্তব্যেও অনেক সময় এমন সাধারণীকরণ দেখা যায়-যেন চাঁদাবাজি এবং বিএনপি সমার্থক দুটি শব্দ। এমন বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু দায়িত্বশীল রাজনীতির মানদণ্ডে তা কতা গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।

বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও পুরোনো রাজনৈতিক দল। সারা দেশে দলটির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন। এত বড় একটি সংগঠনের কোনো ব্যক্তি বা কোনো পর্যায়ের নেতা-কর্মী কখনো চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়াবেন না- এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ কারও নেই। বরং কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত হতে হবে, প্রমাণ পাওয়া গেলে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু একই যুক্তিতে কোনো ব্যক্তির অপরাধ বা অভিযোগের দায় লাখ লাখ নেতা-কর্মীর একটি দলের ওপর চাপিয়ে দিয়ে গোটা দলকে “চাঁদাবাজ” বলাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের সাম্প্রতিক ঘটনাটি এ ক্ষেত্রে একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ।

ঘটনার পর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু পুলিশ ও সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত প্রাথমিক তদন্তের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি মূলত জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে ঘটেছে; সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও হামলার মূল লক্ষ্য ছিল না এবং এ ঘটনায় চাঁদাবাজির প্রমাণও তারা পায়নি। পরবর্তী সময়ে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; সর্বশেষ একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেলকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্ত এখনো চলছে।এখানেই দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো নাগরিক আক্রান্ত হলে তিনি ক্ষুব্ধ হবেন- এটাই স্বাভাবিক। নিজের সম্পদ ধ্বংস হতে দেখে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যখন প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক দলকে একটি অপরাধের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে যুক্ত করেন, তখন তার বক্তব্যের সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি। তাই অভিযোগ সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কে চাঁদা চেয়েছে, কখন চেয়েছে, কত টাকা চেয়েছে- এসব তথ্য থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দিতে হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে সেটিও তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

একই দায়িত্ব রাজনৈতিক বিরোধীদেরও রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করা বিরোধীদলের অধিকার এবং দায়িত্ব। কিন্তু প্রতিটি অপরাধের সঙ্গে তথ্য-প্রমাণের আগেই একটি দলের নাম জুড়ে দেওয়া সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করে না। আজ বিএনপির বিরুদ্ধে এমন সাধারণীকরণ গ্রহণযোগ্য করে তুললে আগামীকাল অন্য কোনো দলের বিরুদ্ধেও একই পদ্ধতি ব্যবহৃত হবে। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সত্য এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি- দুটিই। তবে এই আলোচনার আরেকটি দিক আরও গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো- বাংলাদেশ থেকে চাঁদাবাজি বন্ধ হতেই হবে।

চাঁদাবাজি কে করছে, সে বিএনপি, বিরোধী দল, কোনো ব্যবসায়ী সংগঠন, পরিবহন সংগঠন কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত কি না- রাষ্ট্রের কাছে সেটি বিবেচ্য হওয়ার কথা নয়। চাঁদাবাজের একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত- সে অপরাধী।

চাঁদাবাজিকে আমরা অনেক সময় ছোটখাটো রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখি। বাস্তবে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি অনেক গভীর। বাজারে পণ্য পরিবহন থেকে দোকান পরিচালনা, নির্মাণকাজ থেকে পরিবহন খাত- প্রতিটি পর্যায়ে অবৈধ চাঁদা শেষ পর্যন্ত ব্যবসার খরচ বাড়ায়। ব্যবসায়ী সেই বাড়তি ব্যয় নিজের পকেট থেকে বহন করেন না; তা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজির মূল্য পরিশোধ করেন সাধারণ ভোক্তা। এর আরও ভয়াবহ দিক আছে।

চাঁদাবাজি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে অসহায় করে, স্থানীয় পর্যায়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি করে এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে দুর্বল করে। একজন ব্যবসায়ী যদি মনে করেন বৈধ লাইসেন্স, কর প্রদান ও আইন মেনে চলার পরও তাকে ব্যবসা করতে স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিয়মিত অর্থ দিতে হবে, তাহলে সেখানে আইনের শাসনের মৌলিক ধারণাটিই ভেঙে পড়ে। এ কারণেই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং সুশাসনের প্রশ্নও।

এখানে বিএনপির দায়িত্ব অন্য অনেক দলের তুলনায় এখন বেশি। কারণ দলটির কাছে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একটি দলের কাছে মানুষ শুধু উন্নয়ন চায় না; তারা চায় নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন। ফলে বিএনপির কোনো নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠলে তার ক্ষতি শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দলটির ভাবমূর্তি এবং সরকারের ওপর মানুষের আস্থা। যে মানুষ পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে একটি রাজনৈতিক শক্তির দিকে তাকান, সেই দলের কারও বিরুদ্ধে দখল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার হতাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়। এই বাস্তবতা বিএনপির নেতৃত্বকে বুঝতে হবে।

দলের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি করলে প্রথম প্রতিরোধটিও দলের ভেতর থেকেই আসা উচিত। অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং অপরাধের প্রমাণ থাকলে আইনি ব্যবস্থা- দুটিই প্রয়োজন। দলীয় বহিষ্কার কোনো ফৌজদারি অপরাধের বিচার নয়; আবার মামলা হয়েছে বলে সাংগঠনিক জবাবদিহিও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকেও এ বিষয়ে একটি দ্ব্যর্থহীন রাজনৈতিক বার্তা প্রত্যাশিত। সেটি কোনো মামলায় হস্তক্ষেপের নির্দেশ নয়। বরং বার্তাটি হওয়া উচিত- বিএনপির নাম, পদ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি করলে তাকে দল রক্ষা করবে না; আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আর এই নীতি শুধু বিএনপির জন্য নয়। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, চাঁদাবাজির অভিযোগ একই মানদণ্ডে তদন্ত হবে।

কোনো বিরোধী দলের নেতা করলে যেমন ছাড় নেই, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীর ক্ষেত্রেও তেমনি ছাড় থাকবে না। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের সংস্কৃতিও বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কারণ মিথ্যা অভিযোগ শুধু অভিযুক্তের ক্ষতি করে না, প্রকৃত অভিযোগগুলোকেও দুর্বল করে দেয়। প্রতিদিন সব ঘটনাকে ‘চাঁদাবাজি’ এবং সব চাঁদাবাজিকে একটি নির্দিষ্ট দলের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে এক সময় সত্যিকারের ভয়াবহ চাঁদাবাজির অভিযোগও মানুষের কাছে রাজনৈতিক প্রচারণা বলে মনে হতে পারে। তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন দুটি কাজ একসঙ্গে করা। চাঁদাবাজকে নির্মূল করতে হবে আবার প্রমাণহীনভাবে কাউকে চাঁদাবাজ বলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিও পরিহার করতে হবে।

বিএনপির জন্যও এটাই সবচেয়ে নিরাপদ ও সম্মানজনক পথ। দলটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ মিথ্যা হলে তথ্য দিয়ে তার প্রতিবাদ করতে হবে। আর অভিযোগ সত্য হলে অপরাধীকে রক্ষা নয়, আইনের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ একটি বড় রাজনৈতিক দলের মর্যাদা অপরাধীকে আড়াল করার মধ্যে নয়; বরং নিজের ঘর পরিষ্কার রাখার সক্ষমতার মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের জন্যও একই সত্য প্রযোজ্য। চাঁদাবাজির কোনো দলীয় পরিচয় থাকতে পারে না। আইনের চোখে তার পরিচয় একটাই- অপরাধী।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

বিমানবন্দরে জামায়াত নেতার ক্ষমতার প্রদর্শন যে প্রশ্নগুলো সামনে আনল
০৫ অক্টোবর ২০২৬

বিমানবন্দরে জামায়াত নেতার ক্ষমতার প্রদর্শন যে প্রশ্নগুলো সামনে আনল

আহসান হাবিব বরুনসম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ও নজিরবিহীন ঘট...

তৌফিক ইমরোজ খালিদী ও টার্নিং পয়েন্টস: দেশের সাংবাদিকতার বৈশ্বিক সংযোগ
০৪ অক্টোবর ২০২৬

তৌফিক ইমরোজ খালিদী ও টার্নিং পয়েন্টস: দেশের সাংবাদিকতার বৈশ্বিক সংযোগ

রাজীব নন্দীবিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম আমার রোজকার খবরের অন্যতম প্রধান উৎস। শুরু থেকেই এই সংবাদমাধ্যমট...

কিউআর বদলেছে, নাগরিকের প্রশ্ন বদলায়নি
০৪ অক্টোবর ২০২৬

কিউআর বদলেছে, নাগরিকের প্রশ্ন বদলায়নি

শামসুল আলমঅক্টোবরের প্রথম সকালেই মনে পড়ে যায় ২০০১ সালের কথা- অবাধ সুষ্ঠু ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরি...

সবার আগে প্রয়োজন জনসেবার মানোন্নয়ন
০৩ অক্টোবর ২০২৬

সবার আগে প্রয়োজন জনসেবার মানোন্নয়ন

ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসানএকজন সাধারণ নাগরিকের কাছে সরকারের মান যাচাই হয় নীতিমালা, উন্নয়ন পরিকল্পনা কি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আদালতে হেলমেট ছুড়ে আখতারুজ্জামান বললেন, কেন পরব

রিমান্ড শুনানির জন্য আদালতে নেওয়ার সময় মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন। শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। প্রিয় পাঠক আপনি কি মনে করেন তিনি সঠিক প্রশ্ন করেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে