আহসান হাবিব বরুন
সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ও নজিরবিহীন ঘটনাটি দেশের সচেতন মহলকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও স্তম্ভিত করেছে। মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীদের ব্যাগেজ পেতে বিলম্ব ও জমজমের পানি সরবরাহে সাময়িক বিড়ম্বনাকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর নেতা, অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান রঞ্জন যে ধরনের অমার্জিত, ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অনভিপ্রেত ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তা কোনো সুস্থ ও দায়িত্বশীল নাগরিকের কাছ থেকেই প্রত্যাশিত নয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি তার এই আচরণ কেবল আইনের শাসনের ওপরই আঘাত নয়, বরং দেশের সার্বিক রাজনীতি, শিষ্টাচার এবং বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও একাধিক গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, ব্যাগেজ পেতে বিলম্বের খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়েছিলেন নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ। কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত করার তো দূরের কথা, অভিযোগ অনুযায়ী, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জন হঠাৎ চরম ক্ষিপ্ত হয়ে তার দিকে ধেয়ে যান, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং প্রকাশ্যে পিটিয়ে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন। এখানেই শেষ নয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী সম্পর্কেও অত্যন্ত অশালীন বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তার সঙ্গে থাকা প্রটোকল সহকারীদের সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণে বাধা দিলে তাকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে সাধারণ যাত্রীদের পবিত্র জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মীদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করার অভিযোগও উঠেছে।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে সরকারি কর্মকর্তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা, অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করা এবং সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করা কোনো সভ্য বা দায়িত্বশীল মানুষের কাজ হতে পারে না। সেবা পেতে বিড়ম্বনা হলে বা কোনো অভিযোগ থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে তা জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এভাবে নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এখানে বলে রাখা ভালো যে, মেজর আখতারুজ্জামানের এই উগ্র ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণ মূলত তার পুরোনো অভ্যাসগত আচরণেরই ধারাবাহিকতা বলে মনে হতে পারে। তার রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি থেকে তিনি বিভিন্ন সময়ে অন্তত পাঁচবার বহিষ্কৃত হয়েছেন। বারবার দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তিনি যেখানেই থাকুন কিংবা যে পরিচয়েই কথা বলুন না কেন, বিতর্ক সৃষ্টি করা যেন তার রাজনৈতিক জীবনের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সেই বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
অবশ্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা ও ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তুষ্টির বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এটি একদিনে তৈরি হওয়া কোনো সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা প্রশাসনিক দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের ফল। একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র আট মাসের মধ্যে অর্ধশতকের পুরোনো এই পর্বতপ্রমাণ জঞ্জাল রাতারাতি পরিষ্কার করে ফেলবে- এমন আশা করা বাস্তবসম্মত চিন্তার পরিচায়ক নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। কিছুদিন আগেই তিনি জাতীয় সংসদে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, দেশের সর্বত্র দুর্নীতি ও অনিয়মের পাহাড় জমেছে। তিনি সেই জঞ্জাল দূর করে একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
প্রশাসনিক জবাবদিহি ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে সরকারের এই অবস্থানের প্রতিফলন বিমানবন্দরের ঘটনাতেও দেখা গেছে। জামায়াতে ইসলামীর চারজন সংসদ সদস্য যখন ভোগান্তির শিকার হয়ে নিয়ম মেনে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ উত্থাপন করেন, তখন সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দায়িত্বে অবহেলা ও পরিচালনাগত গাফিলতির বিষয় উঠে আসার পর ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধান ও ফ্লাইট সুপারভাইজর সাদ্দাম হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর পাশাপাশি নিজস্ব মজুত থেকে দ্রুত জমজমের পানি বিতরণের ব্যবস্থা করে যাত্রীদের ভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সরকারের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, নিয়মতান্ত্রিক অভিযোগের ভিত্তিতে কীভাবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। সরকার যেখানে নিয়মমাফিক অভিযোগে দ্রুত সাড়া দিচ্ছে, সেখানে মেজর আখতারুজ্জামানের মতো ব্যক্তিদের এ ধরনের উগ্র ও তাণ্ডবমুখী পথ বেছে নেওয়া একেবারেই অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক। তবে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অপরাধ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়া নয়; তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই তাদের দায় নির্ধারিত হওয়া উচিত।
জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের নেতাকর্মীদের সাম্প্রতিক আচার-আচরণ বিশ্লেষণ করলে অনেক ক্ষেত্রেই এমন ধারণা তৈরি হয় যে তারা বিভিন্ন বিষয়ে সংঘাতমুখী অবস্থান নিচ্ছেন। বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল বা বিতর্কিত করার কোনো অপচেষ্টা যদি থেকে থাকে, তবে তা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিরোধী দলের প্রধান কাজ অবশ্যই সরকারের সমালোচনা করা। তবে তা হতে হবে গঠনমূলক ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক। অন্ধ বিরোধিতা না করে দেশের স্বার্থে সরকারকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতা করাও একটি আদর্শ বিরোধী দলের অন্যতম দায়িত্ব। যে দলটি নীতি, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলে, অথচ তাদের নেতাদের কাছ থেকে যখন অশালীন, অনৈতিক কিংবা আইনবিরোধী আচরণের অভিযোগ ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে দলটির নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ইসলাম কেবল পোশাক বা লেবাসের বিষয় নয়; ইসলামকে ফুটিয়ে তুলতে হয় বিনম্র আচরণ, মননশীলতা, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার মাধ্যমে। জামায়াতের নেতাকর্মীদের আচরণে এই মূল্যবোধের প্রতিফলন কতা ঘটছে, তা নিয়ে দলটির আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন।
এখানে একটি ঐতিহাসিক সত্যকেও অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতিতে পুনর্জন্ম দিয়েছিল বিএনপি। অথচ ক্ষমতার মোহে অন্ধ জামায়াত আজ তাদের সেই চরম দুর্দিনের সহযোগী কান্ডারী বিএনপি ও বিএনপি পরিচালিত সরকারকে বিতর্কিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিএনপির পেছনে বারবার ছুরি মারার এই রাজনীতি এদেশের মানুষ কখনোই ভালো চোখে দেখেনি। জামায়াতকে অনুধাবন করতে হবে, তাদের এই উস্কানিমূলক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের ফলে যদি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পতিত পলাতক স্বৈরাচার কোনোভাবে ফের মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, তবে আখেরে তাদের নিজেদের অস্তিত্বই সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে পড়বে।
পরিশেষে বলতে চাই, বিমানবন্দর হলো একটি দেশের প্রবেশদ্বার, যেখানে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নির্ভর করে। সেখানে তাণ্ডব চালিয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মীদের লাঞ্ছিত করা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও সার্বভৌম মর্যাদার ওপর আঘাত হানার শামিল। নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিবের দায়ের করা মামলার পর সিসিটিভি ফুটেজ ও সাক্ষ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, যা সরকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠারই দৃষ্টান্ত। ক্ষমতার দাপট কিংবা অশালীন আচরণ দেখিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে থাকতে পারে না। সুতরাং রাজনৈতিক অঙ্গনে শিষ্টাচার ও বিনয় ফিরিয়ে আনা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহিহ বুঝ নসিব করুন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬