কন্যাশিশু জন্মের পর লিঙ্গ পরিচয়ই যেন তার স্বপ্ন দেখার অধিকার হরণ করতে চায়। অথচ একজন মানুষ হিসেবে পৃথিবীর সব সুযোগ ও স্বপ্ন দেখা এবং তা বাস্তবায়নে তারও সমান অধিকার আছে। তবে বাস্তবতায় এখনো অনেক কন্যাশিশুকে শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা নিজের পছন্দের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। এক্ষেত্রে ধর্মীয় ও নানান সামাজিক কুসংস্কারও দায়ী। কখনো সেটি দারিদ্র্য আবার কখনো নিরাপত্তাহীনতা কন্যাশিশুর বেড়ে ওঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক পরিবারে ছেলের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে কিংবা পারিবারিক দায়িত্বের চাপ এসে পড়ে। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক কন্যাশিশুর পড়াশোনা হয় না। এ বিয়য় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার
যে কোনো কল্যাণমূলক সমাজ ও রাষ্ট্র সৃষ্টির জন্য নারী-পুরুষ উভয়ের অবদান অনস্বীকার্য। সমাজের অসঙ্গতি ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখ অবদান রেখেছেন। তাদের পথ অনুসরণ করে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব নেওয়া উচিত। কারণ কন্যাশিশুকে বাদ দিয়ে আমরা কখনোই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করতে পারব না।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ উপাত্ত অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার প্রায় ৩০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি, প্রায় ৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, মাধ্যমিকে মেয়েদের ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ বাল্যবিয়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিয়ের কারণে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
একটি কন্যাশিশুর শিক্ষা শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; একটি পরিবার, সমাজ ও দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নেও জড়িত। তাই মেয়েদের বিদ্যালয়ে আনার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখা, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিয়ের ঝুঁকি থেকে তাদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কন্যাশিশুদের এই ঝরে পড়ার পেছনে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, আর্থিক অসচ্ছলতা এবং পরিবারের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাসহ বিভিন্ন বহুমুখী কারণ জড়িত থাকে। তাই কেবল প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির হার বাড়ালেই চলবে না, বরং কন্যাশিশুরা যেন তাদের পড়াশোনা সফলভাবে শেষ করতে পারে এবং উচ্চশিক্ষায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তার জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে আরও কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের জোরালো দাবি। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সময় নেওয়া উদ্যোগ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং মেয়েদের জন্য প্রবর্তিত বিভিন্ন উপবৃত্তির কল্যাণে গত কয়েক দশকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার ক্ষেত্রে লৈঙ্গিক সমতা অনেকটাই অর্জিত হয়েছে- যা দেশের সামগ্রিক সাক্ষরতা ও নারীশিক্ষার অগ্রযাত্রায় একটি বড় অর্জন। তবে এই প্রাথমিক সাফল্যের পরও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে যখন শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিকে পদার্পণ করে, তখন তাদের একটি বড় অংশের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার অত্যন্ত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
কন্যাশিশু ও নারীকে অবজ্ঞা, বঞ্চনা ও বৈষম্যের মধ্যে রেখে কখনই একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ে উঠতে পারে না। এই বাস্তবতায় নারী ও কন্যাশিশুর শিক্ষার বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। সেটি শুরু করতে হবে কন্যাশিশুর জন্য সর্বোচ্চ বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে। পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে তাদের জন্য সমসুযোগ ও সম-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। আর এই মানবসম্পদ গড়ার প্রক্রিয়াটি শুরু করতে হবে কন্যাশিশুর জন্মলগ্ন থেকেই। মনে রাখতে হবে, আজকের কন্যাশিশু আগামী দিনের একজন সুশিক্ষিত মহীয়সী নারী ও আদর্শ মা এবং সেই আলোকবর্তিকা হিসেবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আলোকিত করবে।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬