ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির নেতারা বলেছেন, আন্দোলন থামবে না, বরং দিন দিন আরো তীব্র হবে এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। তাঁদের দাবি, বর্তমান সরকারের পতন আসন্ন।
পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে নয়াদিল্লির প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়ায় সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। তাঁরা অভিযোগ করেন, নিজ দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে সরকার যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর লজ্জিত হওয়া উচিত। তাঁদের ভাষ্য, সরকার দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গত শনিবার সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের ভেতর থেকে সিজেপির তিন নেতা অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে আটক করা হয়। রোববার সকালে তাঁদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে এক বছর শান্তিভঙ্গ করতে পারবেন না - এমন শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়।
মুক্তি পাওয়ার পরই সিজেপি জানায়, দুপুর দুইটায় সংবাদ সম্মেলনে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে সৌরভ ও আশুতোষ জানান, তাঁদের লড়াই থামছে না। বরং আন্দোলন আরো তীব্র হবে এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে।
সৌরভ দাস বলেন, সরকার ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে, কারণ তারা নিজেরাই ভীত ও সন্ত্রস্ত। তাঁর অভিযোগ, সরকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষা করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। কেন তাঁকে রক্ষার জন্য এত তৎপরতা, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সিজেপির এই নেতা দেশটির যুবসমাজকে রাস্তায় নেমে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় নেমে সবাই জানান। মানুষকে বোঝান, গোটা ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। দেশটা চলছে স্রেফ দুজন মানুষকে বাঁচানোর জন্য। একজন নরেন্দ্র মোদি, অন্যজন অমিত শাহ।’
সৌরভ আরো প্রশ্ন তোলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রধান বিচারপতিও যে রক্ষাকবচ পান না, সেখানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও দুই নির্বাচন কমিশনারকে কেন বিশেষ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে আজীবন মামলা করা যাবে না - এমন বিধানের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে অন্যায় কাজ করানোর উদ্দেশ্যেই এ ধরনের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বারানসিতে নরেন্দ্র মোদির জয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির আইনবিষয়ক শাখার নেত্রী রত্না সিং উপস্থিত ছিলেন। সৌরভ, আশুতোষ ও রত্না অভিযোগ করেন, পুলিশ তাঁদের দলের নেতাদের আটক বা গ্রেফতার করেনি, বরং অপহরণ করেছে। তাঁদের দাবি, অভিজিৎ, আশুতোষ ও সৌরভকে আলাদা আলাদা স্থানে রাখা হয়েছিল। তাঁদের ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং আইনজীবী বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। ফোনে আপত্তিকর কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে পরে হয়রানি করা হতে পারে বলেও তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সিজেপি নেতাদের অভিযোগ, ধরপাকড়ের সময় দিল্লি পুলিশ গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও ছাড় দেয়নি। তাঁদের দাবি, সরকার প্রকৃত তথ্য প্রকাশের পথ বন্ধ করতে চায়।
দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে শিখদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগও তোলেন তাঁরা। আশুতোষ রাঙ্কার দাবি, পুলিশ জুতা পায়ে গুরুদুয়ারে প্রবেশ করেছিল। তিনি বলেন, শনিবারের ঘটনা ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়ের পরিস্থিতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। স্বাধীন ভারতে এমন পুলিশি আচরণ আগে দেখা যায়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে প্রায় ২৪ ঘণ্টা আটক থাকার পর মুক্তি পেয়ে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করেছেন। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ। এত বড় কাপুরুষ ও জুলুমবাজ এ দেশ আগে কখনো দেখেনি।’
গত শনিবার যন্তর মন্তরে সিজেপির পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দিতে বেঙ্গালুরু থেকে মুম্বাই হয়ে দিল্লি পৌঁছান অভিজিৎ দিপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। বিমানবন্দরে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজের ভেতর থেকে তাঁদের আটক করা হয়। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়।
আটকের পরও আন্দোলন থেকে সরে না আসার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
সানা/আপ্র/১১/১০/২০২৬