যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিসহ দেশটি থেকে তেল, গম, সয়াবিন ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে মার্কিন সহায়তা বৃদ্ধির প্রত্যাশা করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ঋণনির্ভরতা কমিয়ে যৌথ ও সরাসরি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বাড়ানোর প্রত্যাশা: মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং আর্থিক সহায়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় সহায়তাসহ দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যে সংস্থা অনুদান দেয়, তাদের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে।
অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহায়তা সেভাবে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করছে। উড়োজাহাজের পাশাপাশি তেল, সয়াবিন ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য কেনা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা আসা উচিত।
তিনি বলেন, “আমরা জোর করে তুলে ধরেছি যে এখন যদি না আসে তো কবে আসবে। এরকম একটা সম্পর্ক, যেখানে বাংলাদেশ এতগুলো আমদানি করে। আমরা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য কমানোর বিষয়ে তাদের যে চাওয়া, সেটি পূরণ করছি। সেই ক্ষেত্রে এই সহায়তাগুলো আসা উচিত। তারা একমত হয়েছে, দেখা যাক কী হয়।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত বছর শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ে। তাঁর আরোপিত ৩৫ শতাংশ শুল্কের চাপ সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ। এর অংশ হিসেবে দুই ধাপে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে সরকার।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-ওয়াশিংটন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে চুক্তিটি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। পরবর্তী সময়ে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিও করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে সরকার।
চীনের ঋণের বদলে বিনিয়োগে গুরুত্ব: চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার ধরন পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে শুধু সার্বভৌম ঋণ বা অন্য ধরনের ঋণের ওপর নির্ভর না করে ধীরে ধীরে ইকুইটি বা মালিকানাভিত্তিক বিনিয়োগের দিকে যেতে চায় বাংলাদেশ।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ঋণনির্ভরতা কমিয়ে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে চীনের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যতে চীনের যেসব বিনিয়োগ আসবে, সেগুলো যেন ক্রমান্বয়ে ঋণের পরিবর্তে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হয়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে বলে সরকার আশা করছে।
তিনি বলেন, যৌথ বিনিয়োগ ও সরাসরি বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বিনিয়োগ বাড়ানো। ঋণের পরিবর্তে ক্রমান্বয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
কৃষি সহায়তা নিয়ে ইফাদের সঙ্গে আলোচনা: কৃষি খাতে সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইফাদ বাংলাদেশের কৃষি খাতে সহায়তা প্রদানকারী জাতিসংঘের একটি সংস্থা। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কৃষি খাতে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, আলোচনা ভালো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, চীনের সঙ্গে ঋণের পরিবর্তে বিনিয়োগনির্ভর সহযোগিতা এবং কৃষি খাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর বিষয়ে এসব আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।
সানা/আপ্র/১৪/১০/২০২৬