দূর থেকে দেখলে মনে হবে আধুনিক কোনো করপোরেট অফিস ভবন। কাঁচে মোড়া সুউচ্চ স্থাপনা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায় এটি অফিস নয়, বরং ভবিষ্যতের এক নতুন কৃষিক্ষেত্র। দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সিছুয়ান প্রদেশে গড়ে উঠেছে এমনই এক বিস্ময়কর শস্য কারখানা, যেখানে মাটির মাঠ নয়, বরং আকাশছোঁয়া ভবনের ভেতরেই চাষ হচ্ছে ধান, গম ও বিভিন্ন ফসল।
এই অত্যাধুনিক প্রকল্পটি তৈরি করেছে চাইনিজ একাডেমি অব অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস। পুরো ব্যবস্থাটি পরিচালিত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে। এখানে ফসলের বৃদ্ধি আর প্রকৃতির খামখেয়ালির ওপর নির্ভর করে না। আলো, তাপমাত্রা, বাতাস, পানি ও পুষ্টি-সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় কম্পিউটারনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায়।
ইন্সটিটিউট অব আরবান অ্যাগ্রিকালচারের প্রধান নির্বাহী ওয়াং সেন বলেন, “নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এটি এক ধরনের শস্য কারখানা। এখানে শিল্প-কারখানার মতোই নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফসল উৎপাদন করা হয়। আলো, তাপমাত্রা, পানি ও পুষ্টি সবকিছুই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত।”
এই ভবনের উচ্চতা প্রায় ২০ তলা। গবেষকদের মতে, প্রচলিত কৃষিজমির তুলনায় এখানে একই জায়গায় প্রায় ১২০ গুণ বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব। কারণ প্রতিটি তলাকে আলাদা চাষের ক্ষেত হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং প্রতিটি স্তরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ফসল বেড়ে ওঠে দ্রুত ও স্বাস্থ্যকরভাবে।
এই শস্য কারখানার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি হলো প্রজনন গতিবর্ধক ব্যবস্থা। সাধারণত একটি নতুন গমের জাত উদ্ভাবনে যেখানে ৮ থেকে ১২ বছর সময় লাগে, সেখানে এই নিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম পরিবেশে সেই কাজ শেষ করা যাচ্ছে মাত্র এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই। জলবায়ু পরিবর্তন, খরা কিংবা অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক ঝুঁকিও এখানে উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে না।
এর বাস্তব সুফল এরইমধ্যে দেখা যাচ্ছে ছেংতু শহরের ওয়েনচিয়াং জেলাতে। সেখানে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরে শুরু হয়েছে স্ট্রবেরি চাষ। খোলা মাঠে একটি স্ট্রবেরি গাছ বছরে যেখানে গড়ে মাত্র ৩০০ গ্রাম ফল দেয়, সেখানে এই স্মার্ট কৃষি কারখানায় একটি গাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৫০০ গ্রাম ফল অর্থাৎ প্রায় পাঁচ গুণ বেশি উৎপাদন।
অ্যাগ্রো-টেক কোম্পানি ফিউচার ফার্মসের চেয়ারম্যান ফং চিয়ে বলেন, আমাদের প্রযুক্তি এখন বিশ্বমানের। উজবেকিস্তানের মতো অনেক দেশ ইতোমধ্যে এই ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। ভবিষ্যতের কৃষি হবে অবকাঠামো-নির্ভর এবং প্রযুক্তিভিত্তিক।
চীন এই প্রযুক্তিকে শুধু পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রাখেনি। দেশের আসন্ন চীনের ২০২৬-২০৩০ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতে ‘স্মার্ট ফার্মিং’ বা কারখানা-ভিত্তিক কৃষিকে দেশব্যাপী সম্প্রসারণের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, এটি ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান কৌশল হয়ে উঠতে পারে। সূত্র-সিসিটিভি, সিএমজি
সানা/ডিসি/আপ্র/৩০/৩/২০২৬